অভিমতলীড

প্রিয় ডাক্তার! সপ্তাহে একদিন শুধু নিজেকে সময় দিন

ডা. শামসুল আলম :

একজন ডাক্তারকে সপ্তায় একদিন শুধুমাত্র নিজেকে সময় দেয়া উচিত।

অনেক জুনিয়র ডাক্তার মনে করেন-
যেদিন তিনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হয়ে যাবেন, অনেক রোগী হবে, টাকা -পয়সা হবে সেদিন সব সুখ তার ঘরে চলে আসবে।

কথা কিছুটা সত্যি, আমরা যারা এইসব পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি তারা এখন কিছুটা সুখ অবশ্যই অনুভব করছি। সবচেয়ে বড় সুখ হলো সামনে কোন পরীক্ষা নেই।

তবে এখানে একটা কিন্তু আছে।
সেই কিন্তুটা কি, একটু বিস্তারিত আলোচনা করছি।

মনে করুন, আপনি একটা ক্লিনিকে চাকরি করেন, আপনার বেতন মাসিক বিশ হাজার টাকা।
আজকে আপনার একটা ইভনিং ডিউটি আছে কিন্তু যেতে ইচ্ছে করছে না, ক্লান্তি ভর করছে, একটু বাইরে কোথাও বেড়াতে ইচ্ছে করছে কিন্তু তারপরও আপনাকে কাজে যেতে হবে।
একটা বড় কারন হলো, টাকা।
ডিউটিটা না করতে পারলে, এক হাজার টাকা মিস হয়ে যাবে।

এইবার মনে করুন দশ বছর পর আপনি একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হলেন।
কিন্তু আজকে বিকালে চেম্বারে যেতে মন চাইছে না, ফ্যামিলিকে একটু সময় দিতে ইচ্ছে করছে।
কিন্তু আপনি পারবেন না।
কেন ?
কারন, আবারো টাকা।
বিশ হাজার টাকা লস।

একসময় যে টাকা আপনি মাসে ইনকাম করতেন সেটা এখন আপনার দৈনিক আয় তবুও আপনি পারবেন না।

এখন কারনটা বলি,
কারন হলো, আমাদের চাহিদা বৃদ্ধি।
আপনার আয় বাড়বে বিশ গুণ সেই সাথে আপনার চাহিদাও বাড়বে বিশ গুণ।
আপনার গাড়ি- বাড়ি, বাচ্চা -কাচ্চা, বিদেশ ভ্রমন, আত্মীয় -স্বজনের আবদার এর পর আবার রোগী চলে যাবে, প্র্যাক্টিস কমে যাবে এইসব ছাড়াও আরও অনেক কারন তখন যোগ হবে।

(আমি যদি মিথ্যে বলে থাকি তাহলে আপনি, আপনার আসে -পাশের দশ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে যাচাই করে দেখতে পারেন )

তাহলে কি বুজলেন ?
একজন ডাক্তারের জীবন এমনই।
আমাদের মৃত্যু পর্যন্ত কাজ করতে হবে, আয় করতে হবে, চাহিদা মিটাতে হবে।

তবে এখানে হতাশার কিছু নেই। যে কোন পেশাতেই জীবন একই রকম।
সুতরাং যে কোন কাজেই আমাদেরকে আনন্দ খুঁজে বের করতে হবে, কাজটাকে ভালোবাসতে হবে।

কিন্তু একটা দিন,
সপ্তায় একটা দিন, শুধু মাত্র নিজের জন্য।
কোন কাজ নয়, পড়াশুনা নয়।

কি করবেন এই দিনে?

খুব ভোর বেলায় উঠে হাত মুখ ধুঁয়ে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে বসুন। ভালোবেসে মন থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করুন। যে মানুষের মনে কোন কৃতজ্ঞতা নেই তার মনে কখনো ভালোবাসা ও শান্তি জন্ম নিবে না।
সুতরাং কৃতজ্ঞতা হলো প্রথম স্টেপ।

এরপর সূর্য উঠার আগেই বাইরে একটু হাঁটতে বের হবেন। ভোর বেলায় সব সুন্দর দেখা যায়। কাকের কা কা শব্দও তখন কেমন জীবন্ত লাগে। এই সময় খেটে খাওয়া মানুষেরা দু বেলা খাবারের জন্য বেরিয়ে পড়ে। তাঁদেরকে দেখলে নিজেকেও কেমন মানুষ মনে হয়।

হেঁটে আসুন ঘন্টা খানেক। তারপর বাসায় ফিরে নাস্তা বানাতে শুরু করুন।
নিজ হাতে রুটি বানাবেন। আলু ভাজি করুন। নিজের সঙ্গী থাকলে তার জন্যও নাস্তা রেডি করতে পারেন।
নাস্তা শেষে এক কাপ গরম চা নিয়ে বসুন।
সাথে কেউ থাকলে ভালো, গল্প করবেন। আর কেউ না থাকলে ইউ টিউবে ছেড়ে দিন ফরাসি মিউজিসিয়ান আরমান্দ আমারের সুন্দর কোন মিউজিক কিনবা দীপক চোপড়ার কণ্ঠে রুমির কবিতা।
সাবধান এই দিন আপনি কোন পত্রিকা পড়বেন না।
কয়েকটা খুন, হত্যা, ধর্ষন আর মুলা মন্ত্রীর বাঁশের সেতুর উদ্বোধনের খবর আপনার আজকে না জানলেও কোন সমস্যা নেই।
আপনার একটা মাত্র দিন।
এই দিন ভুলেও ফেসবুক লগ ইন করবেন না, আজ আপনি কাউকে চিনেন না।
কে কয়টা লাইক পেলো, সেই হিসাব না হয় অন্য কোন দিন করবেন।
আজ আপনার চোখে শুধু আপনার সঙ্গী, যাকে আপনি রোজ ভুলে থাকেন। ফেসবুকে অনেক বিপ্লব হয় কিন্তু একদিনেই সেটা শেষ হয়ে যায় না। সুতরাং কালকেও ফেসবুকের আমেজ পাওয়া যায়।

এরপর কি করবেন?

ব্যাগ নিয়ে বাজারে যাবেন, একটু পুঁই শাক কিংবা ছোট মাছ যেটা অনেকদিন খাওয়া হয়নি সেটা কিনে আনবেন তারপর নিজে রান্নাঘরে গিয়ে রেডি করবেন। কোনো রাঁধুনি থাকলে ভালো, না হয় নিজেই চেষ্টা করবেন।
কিছু না থাকলে আলু ভর্তা আর ডাল।
এরপর বিকেলে দূরে কোথাও বেড়াতে যাবেন, নদী হলে ভালো।
নদীর একটা ভাষা আছে, সে শুধু সমুদ্রের টানে সামনে এগিয়ে যায়।
আমরাও তাই। একটা কি যেন মায়া আমাদেরকেও তাড়া করে ফিরে।
পাশে কেউ থাকলে আজকে জিজ্ঞেস করুন,
জীবনটা কেমন?
সে আপনার সাথে সুখী কিনা?

কতদিন জিজ্ঞেস করা হয়নি তাই না?

রোজ আমরা রোগীদের জিজ্ঞেস করি, “আজ কেমন আছেন?”
কিন্তু যার সাথে রোজ ঘুমাই তাকেই জিজ্ঞেস করা হয়না,
সে কেমন আছে?
আজ সেই দিন।

সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে নিজ হাতে আলো দিন।
আলোর প্রয়োজনীয়তা নিজে না ছড়ালে সত্যি করে বুঝা যায়না।

রাতে না হয় হালকা করে খেলেন।
একটা ভালো গল্পের বই নিয়ে বিছানায় যাবেন।
ঘুম না আসলে, সুন্দর কোন মুভি দেখতে পারেন।
আর যদি পাশে মানুষ থাকে তবে গল্প করুন। আজকের দিনটি নিয়েই গল্প করা যেতে পারে।
গল্প শেষে আরো কিছুটা সময় যদি দেয়া যায় …..তবে মন্দ কি!

একটা সত্যি কথা বলি, বিশ বছর পর আপনি আসলে আর কিছু মিস করবেন না, শুধু মিস করবেন আজকের এই দিনগুলি।

আমরা যারা সব সময় মানুষকে নিয়ে থাকি, আমাদের জন্য এই দিনটি অনেক বেশি প্রয়োজন।
তা নাহলে আমরা একদিন নিজেরাই হারিয়ে যাবো।

শুধু মানুষকে বাঁচালেই হবে না, নিজেকেও বাঁচাতে হবে।