গুণীডাক্তার পরিচিতি

মেডিকেলে ভালো ছাত্র খারাপ ছাত্র বলে কিছু নেই, প্রত্যেকেই অনেক সম্ভাবনাময়

কথা বলেছেন হিউম্যান অব ডিএমসি’র ডা. মাধবী কর্মকার : >>

আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট বলা যায় ক্লাস ফাইভে পুরো খুলনা বিভাগে প্রথম হয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়াটা। স্থানীয় সাংবাদিকেরা সাক্ষাৎকার নিতে এসে জানতে চাইলেন বড় হয়ে কী হতে চাই। বড় হয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই এসব আমার কাছে মুখস্থ বুলি মনে হত। তাই জবাব দিয়েছিলাম আমি সারাজীবন শিক্ষার সাথে জড়িত থাকতে চাই। সেই পথচলায় স্কুল কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে মেডিকেলে আসা এবং ২০০৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে MBBS পাশ করা।

ক্যারিয়ার কোন বিষয়ে করবো তা নিয়ে বরাবরই দ্বিধান্বিত ছিলাম। যেমন : বায়োকেমীস্ট্রীর প্রফেসর মোজাম্মেল স্যারের মনোমুগ্ধকর ক্লাস করে মনে হত শিক্ষকই হব, থার্ড ইয়ারে প্লাস্টিক সার্জারির নিখুঁত কাজ দেখে মনে হত প্লাস্টিক সার্জন হতে না পারলে জীবনটাই বৃথা।

কিন্তু ইন্টার্নশিপ শেষ করার পর উপলব্ধি করলাম মেডিসিনই আমার জায়গা। ইন্টারনাল মেডিসিনে FCPS পার্ট ওয়ান করি ইন্টার্নশিপের পরপরই। এরপর বিসিএস দিয়ে চাকরি জীবন শুরু হল গ্রামে। অনেকেই মনে করেন এই বাধ্যতামূলক গ্রামে থাকাটা উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারে উন্নতির অন্তরায়। কিন্তু আমার মনে হয়েছে এই সময়টাই হতে পারে নিজেকে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রস্তুত করা আর রোগীদের ভালো ব্যবস্থাপনা করতে শেখার আদর্শ সময়।

আমার দুই বোন আমেরিকায় থাকেন বিধায় এক সময় কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম সেখানে ক্যারিয়ার করার। USMLE স্টেপ টু ও শেষ করি। কিন্তু অনেক ভেবে মনে হল দেশেই ত সুন্দর একটা ক্যারিয়ার হতে পারত! সেই সাথে পারিবারিক কিছু বিষয় ভেবে ফিরে এলাম দেশে। এভাবে বিসিএস পোস্টিং, মাতৃত্ব আর আমেরিকায় যাওয়া আসা সব মিলিয়ে ৫ বছর চলে গেছে জীবন থেকে।

আমার সমসাময়িক অনেকেই তখন ট্রেনিং শেষ করে কোর্সে ঢুকে গেছেন, আর আমি তখনও শুরু করিনি। হতাশা পেয়ে বসলো, এখানেই বোধহয় ডাক্তারি জীবনের ইতি ঘটল এমনটা মনে হত মাঝে মাঝে। কিন্তু হাল ছাড়িনি কখনো। পোস্টিং পেলাম ঢাকা মেডিকেলের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে, সেই সাথে এট্যাচমেন্ট নিয়ে কাজ শুরু করি মেডিসিন বিভাগে। আমার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের ৪ বছর পুরোটাই প্রফেসর খান আবুল কালাম আজাদ স্যারের অধীনে কাজ করি।

আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি স্যারের কাছে প্যাশেন্ট ম্যানেজমেন্টের পাশাপাশি একজন ডাক্তার হিসেবে কী কী মানবীয় গুণাবলী থাকা উচিৎ ও কেমন ব্যবহার করা উচিৎ এসব বিষয় প্রত্যক্ষভাবে শিখতে পেরে, যেটা একজন মানুষ ও ডাক্তার হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে আমার জীবনে।

আমার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরে গেল ট্রেনিং পিরিয়ডে একটি বিশেষ কেস নিয়ে কাজ করে। দীর্ঘদিন যাবত রোগীটির রোগ নির্ণয় করা যাচ্ছিল না। অনেকেই বলেছিলেন রোগীটিকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে, কিন্তু মনে হয়েছিল আরো কিছু করার আছে আমাদের। প্রফেসর আজাদ স্যার ও প্রফেসর আহমেদ কবীর স্যারের তত্ত্বাবধানে নিজেদের উদ্যোগে প্রায় দেড় মাস বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে অবশেষে আমরা রোগটি নির্ণয় করতে পেরেছিলাম।

এটি ছিল একটি বিরল রোগ – লাইসোজোমাল স্টোরেজ ডিজিজ। পুরো পৃথিবীতে মাত্র ৫০টি পাবলিকেশন হয়েছে এর, বাংলাদেশে এটিই প্রথম নির্ণীত কেস।

Bangladesh Society of Medicine এ আমি এটি নিয়ে পোস্টার প্রেজেন্ট করলাম এবং পরবর্তীতে American College of Physians (ACP)- Bangladesh chapter থেকে এবস্ট্রেক্ট উইনার হয়ে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আমেরিকায় ACP এর কনফারেন্সে আমার কেস প্রেজেন্ট করার সুযোগ পেলাম।

তিনদিনের কনফারেন্সটিতে আমি young achiever হিসেবে সম্মাননা পাই। ফিরে আসার পর ACP Bangladesh chapter এর অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল মেম্বার করা হয় আমাকে। এখন আমি মেম্বার সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করছি Resident for Fellow Members Committee তে।

আমার মেডিসিন ক্যারিয়ারের অনেক বড় একটি প্রাপ্তি ছিল প্রফেসর খান আবুল কালাম আজাদ স্যার, প্রফেসর কবির স্যার এবং প্রফেসর রোবেদ আমিন স্যারের “101 intererting cases” বইয়ের কো-অথোর ও কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করাটা।

মেডিসিনে ক্যারিয়ার করতে এসে অনেকের কাছেই শুনতে হয়েছে মেয়েরা তো রোগী পাবে না এখানে। ধারনাটা একেবারেই ঠিক না। কারন আমি দেখেছি যে রোগীরা খোঁজে একজন ভালো, মানবিক ডাক্তার; এখানে ছেলে মেয়ে খুব বেশি প্রভেদ করে না। আমার কাছে মনে হয় নিজ বিষয়ে আপডেটেড নলেজ, ভালো ব্যবহার আর সহমর্মিতা নিয়ে রোগীকে নিজের পরিবারের একজন হিসেবে চিকিৎসা দিতে পারলে তারা কখনো ভাববে না ডাক্তার ছেলে কি মেয়ে। সেই আস্থাটা অর্জন করে নিতে হবে।

পরিবার আর ক্যারিয়ারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এটা বোঝা জরুরি যে সব কাজই সমান গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সব সময়ের জন্য নয়। কোন কাজকে কখন প্রায়োরিটি দেয়া উচিৎ সেটা বুঝতে শিখলে আর সাথে পরিবারের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা থাকলে পথচলা অনেক সহজ হয়ে যায়।

যারা চিন্তা করতে ও রহস্যের সমাধান করতে পছন্দ করে তাদের জন্যই মেডিসিন। কারণ আমার মতে মেডিসিন অনেকটা গনিতের মত। এখানে কিছু উপাত্ত দেয়া থাকবে, আর কিছু থাকবে লুকায়িত। সমস্ত কিছু মিলিয়ে হিসাব করে সঠিক রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা দেয়াটা বড় চ্যালেঞ্জ।

নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় শিক্ষক হওয়ার খুব ইচ্ছে আমার, সেই সাথে গবেষণাধর্মী কাজের সুযোগ পেলে করতে চাই। ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোটা খুব উপভোগ করি আমি।

আমার কাছে মনে হয় মেডিকেলে ভালো ছাত্র খারাপ ছাত্র বলে কিছু নেই। প্রত্যেকেই অনেক সম্ভাবনাময়। শুধু দরকার সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ আর সুযোগ।

যে কেউ প্রবল ইচ্ছাশক্তি, নিজের উপর আর সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে গেলে তার সাফল্য আসবেই ।