অভিমতলীড

মেডিকেলের ছাত্ররাই ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সূচনাকারী

অধ্যাপক ডা. আবদুল কাদির খান  (ভাষাসৈনিক, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য বিভাগ) : 

এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ১৯৪৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাই মাতৃভাষা আন্দোলনের অন্যতম সূচনাকারী ছিলেন। মেডিকেল কলেজ হোস্টেলই ছিল আন্দোলনের আঁতুড়ঘর, প্রাণকেন্দ্র। ১৯৪৮ সালের পর ভাষা আন্দোলন ধীরে ধীরে ব্যাপ্তি লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী এবং রাজনীতিবিদ ও সাধারণের সম্পৃক্ততায় তা গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে গুলিবর্ষণের পরপরই গণজোয়ারের গতিসঞ্চার হয়। বাঁচা-মরার লড়াইয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হয় গণ-আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন গণ-আন্দোলনে পরিণত না হলে ‘একুশে’ কখনো ‘ঐতিহাসিক একুশে’তে রূপান্তরিত হতো না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মেডিকেল কলেজের এ অবদানের স্বীকৃতি নেই। একুশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদদের ভাষণে, পত্রপত্রিকার প্রবন্ধে, রেডিও, টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভূমিকার উল্লেখ থাকে না। এমনকি মেডিকেল কলেজের নামটিও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। এর পরিবর্তে বৃহত্তর অর্থে ব্যবহৃত হয় ‘বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর’। এ যেন ‘ক্ষুদ্র’কে অবজ্ঞা করে সত্যকে আড়াল করারই প্রয়াস। এসব অনুষ্ঠানের আলোচনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাউকে সম্পৃক্ত করতেও দেখা যায় না।

একুশে পদক বিতরণের ক্ষেত্রেও এই অবজ্ঞা লক্ষণীয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাষাসৈনিক বা অন্য কোনো ভাষাসৈনিককে বা তাদের প্রতিষ্ঠানকে আজও একুশে পদকে ভূষিত করা হয়নি। ‘ভাষা আন্দোলন’-এর পরিপ্রেক্ষিতে একুশে পদক বিবেচনার কোনো বিধান নেই। মাতৃভাষা আমাদের জীবন, প্রাণ, মন। যাঁদের আত্মত্যাগের ফলে একুশের জন্ম, একুশের পদকে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতির কোনো বিধান নেই। এটা যেমন হাস্যকর, তেমনি অকৃতজ্ঞতাদুষ্ট, দুঃখজনক। লজ্জাকরও বটে।

যা হোক, দীর্ঘদিন থেকেই আমার মনে এ কথাগুলো জমে ছিল। আমি ভাষা আন্দোলনের পেছনের কাতারের এক নগণ্য সৈনিক। সাধারণত কোনো অনুষ্ঠান আলোচনায় আমি যাই না। মনে জমে থাকা কথাগুলো ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে প্রবল হয়ে উঠেছিল, তাই বলা।

এবার স্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে আসি। বয়সের জন্য অনেক ঘটনাই হুবহু মনে নেই। আর ঘটনাও তো কম নয়। অনেকে স্মৃতিচারণা করবেন। আমি শুধু দুটি ঘটনার উল্লেখ করব। একটি দৃশ্য মনে এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে এবং এখনো আমাকে তীব্র বেদনা ভারাক্রান্ত করে তোলে।

১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের দুটি কক্ষ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অঘোষিত কন্ট্রোল রুম হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এখান থেকেই নেতারা আন্দোলনের নির্দেশনা দিতে থাকেন। আগের সিদ্ধান্ত অনুসারে, গাজীউল হক সেদিন মেডিকেল কলেজের আমতলার সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন। সভা শুরু হয়েছিল একুশে ফেব্রুয়ারি সম্ভবত নয়টা বা সাড়ে নয়টার দিকে। আগে থেকেই কার্জন হল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমন্যাসিয়াম এলাকায় খাকি হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ অবস্থান নিয়েছিল। সভা থেকে ছাত্ররা সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১০-১২ জনের একেকটি দল করে পথে নেমে ১৪৪ ধারা ভাঙতে শুরু করেন। এর পরপরই পুলিশ ছাত্রদের ওপরে টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশের হাতে ছিল দুই ফুট লম্বা মালাক্কা রুল (মালাক্কা একধরনের মোটা বেত, এগুলো সহজে ভাঙত না)। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সবাই ছুটছি। আমি মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের কাছে চলে এসেছি। তখনই চোখে পড়ল দৃশ্যটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমন্যাসিয়াম মাঠের সামনে দিয়ে ছিল প্রায় দুই ফুট উঁচু তারকাঁটা ও কাঁটাওয়ালা গাছের বেড়া। একটি ছেলে বড়জোর ১২-১৪ বছর হবে বয়স। দৌড়ে পালাতে গিয়ে পড়ে গেল পথের ওপরে। সঙ্গে সঙ্গে তার ওপরে মালাক্কা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল কয়েকজন পুলিশ। এমন করে পেটাল যে সঙ্গে সঙ্গে সেখানেই মারা গেল ছেলেটি। ওর পরনে ছিল শার্ট আর লুঙ্গি। ছেলেটি ছিল মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনের হোটেলের বয়। এ ছেলেটির লাশ পরে আর পাওয়া যায়নি। আমার মনে হয়, সে ছেলেটিই হয়তো হতে পারে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম শহীদ। কারণ, পুলিশ মেডিকেল কলেজের ভেতরে এসে হোস্টেলের ওপরে গুলি চালিয়েছিল আরও পরে, দুপুর পার হয়ে গেলে। ছেলেটির পরিচয় পরে আর জানা যায়নি। দৃশ্যটি এখনো আমার চোখে ভাসে।

অন্য ঘটনাটি একটু মজার বলেই এখন মনে হয়। আমি ছেলেটির মর্মান্তিক মৃত্যু দেখে হোস্টেলে এসে পৌঁছেছি। মন খুবই খারাপ। ঘটনাটি এমন দ্রুত আর আকস্মিকভাবে ঘটেছিল যে ছেলেটিকে বাঁচানোর মতো কোনো সুযোগই পাওয়া যায়নি। মটু ভাই বলে একজন ছিলেন (পুরো নাম মনে নেই। তিনি সেদিন সভার মাইক লাগানো এসব কাজের দায়িত্বে ছিলেন)। তিনি আমাকে বললেন, নাদেরা বেগমকে দ্রুত হোস্টেল থেকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যেতে।

মহিলারাও সেদিনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী নাদেরা বেগম (অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর বোন) তখন আত্মগোপন করেছিলেন মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে। মটু ভাই বললেন, হোস্টেলে রেইড হতে পারে। সবার চোখ এড়িয়ে দ্রুত কাজটি করতে হবে। সালোয়ারের ওপরে শার্ট পরে পুরুষের সাজ নিলেন তিনি। বিছানার চাদর পেঁচিয়ে মাথায় পাগড়ি পরানো হলো। গোঁফ আঁকা হলো কালি দিয়ে। তারপর হোস্টেলের পশ্চিম দিকের কাঁটাতারের বেড়ার গেট দিয়ে পার হয়ে রিকশায় করে বকশীবাজার দিয়ে হাজারীবাগের আমাদের বাসায় পৌঁছাই। মা তো তাঁকে দেখে রীতিমতো অবাক। একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। আমি মাকে বললাম, ‘সব প্রশ্নের জবাব পাবে, তার আগে তোমার একটা শাড়ি তাঁকে পরতে দাও।’ তাঁকে আমাদের বাড়িতে রেখে চলে আসি মেডিকেল হোস্টেলে।

এর পরের ঘটনা তো ইতিহাসেই আছে। একুশের নানা ঘটনার মধ্যে এ ঘটনা দুটি আমার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

অধ্যাপক ডা. আবদুল কাদির খান: ভাষাসৈনিক, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য বিভাগ।

>> লেখাটি : প্রথম আলো পত্রিকায় ২ ফেব্রুয়ারি ২০১০ এ প্রকাশিত।<<