গল্প আড্ডালীড

অক্সিজেন

মোহিত কামাল :

১.
দলবেঁধে গলদা চিংড়িদল এসে হাজির হলো ঘরে।

‘কোথায় রাখব তোমাদের?’ জিজ্ঞেস করলাম মনে মনে।

‘ আমাদের ক্রোড়ে রাখো আমাদের।’ কিচিরমিচির স্বর বেরোতে লাগল ওদের কাঁটাযুক্ত সুঁচালো শুঁড়ের দুপাশে ঘূর্ণায়মান চোখের মনি ফুঁড়ে।

‘ তোমাদের ক্রোড়টা কোথায়?’

‘পানিতে, সাগরে, নদীতে, মাছচাষের জলাশয়ে।’

‘ওমা! সেখানে ছেড়ে দিলে তো হাতছাড়া হয়ে যাবে তোমরা।’

‘আমাদের কষ্ট হচ্ছে, শ্বাসবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। বাঁচার জন্য আকুল আবেদন করছি! তোমার লোভী চোখ থেকে রেহাই পেতে চাই। অক্সিজেন পেতে চাই। বাঁচতে চাই।’

২.
দরজার বাইরে হইচই হচ্ছে। দুপদাপ পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে ঘরের দিকে। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে রোদকন্যা ঝাপিয়ে পড়ল বুকে।

চিৎকার করে সে বলতে লাগল, ‘ধোঁয়া, কালো ধোঁয়া, রাস্তায় মেঘের মতো কালো ধোঁয়া আমার বুকে ঢুকে গেছে। শ্বাস নিতে পারছি না। আমাকে শ্বাস দাও। বাতাস দাও। আমি শ্বাস নিতে চাই, আব্বু!’

আমার আদরের সোনামনি’কে বুকে নিয়ে দ্রুত চলে এলাম শোবার ঘরে। ফ্যান ছেড়ে দিলাম। এসি অন করে ওর মুখপানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখন কেমন লাগছে, মা?’

রোদকন্যা জবাব দিলো না। ওর মাথাটা আমার কাঁধে রেখে পরম শান্তিতে চোখ বুঁজে রইল।

৩.
মেয়েকে কাঁধে নিয়েই ফিরে এলাম ধবধবে সাদা বক্সফ্রিজের সামনে। বদ্ধ ফ্রিজের ঢাকনার ওপর একটা পানিশূন্য গামলায় রাখা আছে চিংড়িদল। ওঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ঘূর্ণায়মান চকচকে চোখগুলো ম্লান হয়ে গেছে। জ্যোতি হারিয়ে নিভু নিভু হয়ে যাচ্ছে চোখদল। ওদের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না। নিজের মাথাটা ঝুঁকিয়ে ওদের কাছাকাছি এসে শুনতে চাইলাম ওদের কথা।

দূরবর্তী অন্য এক জগৎ থেকে যেন ভেসে এলো ম্লান এক করুণ স্বর,

‘অক্সিজেন! অক্সিজেন! পৃথিবীর অক্সিজেন তোমরা নষ্ট কোরো না। গাছ লাগাও। অক্সিজেন বাঁচাও। নিজেদেরও।’

‘মিনু! এই মিনু! ‘আমার ডাক শুনে ছুটে এলো গৃহকর্মী।

‘কী অইসে, খালুজান?’

‘পানি আনো। দৌড়াও। গামলায় পানি ঢালো।’

তাড়াহুড়োর গুরুত্ব বুঝতে পারল না মিনু। পানি আনার জন্য ধীরগতিতে সে এগিয়ে গেল কিচেনের দিকে।

আমি আবার তাকালাম গলদা চিংড়িদলের গুচ্ছ গুচ্ছ চোখের দিকে। দেখলাম, ওই চোখদলের আলো নিভে গেছে। কালো ধোঁয়ার মতো কালো মেঘে ঢেকে গেছে ওদের মাতৃক্রোড়।