অভিমতলীড

রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি

ডা. কামরুল হাসান সোহেল :

১৮ কোটি মানুষের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙ্গালী করে, মানুষ কর নি।

করোনা খুবই সংক্রামক একটি রোগ। যা ড্রপলেটের (হাঁচি,কাশি) মাধ্যমে ছড়ায়।

তাই করোনা থেকে মুক্ত থাকতে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয় মাস্ক (সার্জিক্যাল মাস্ক/ তিন লেয়ারের কাপড়ের মাস্ক) পরা এবং সামাজিক দূরত্ব (কমপক্ষে ৬ ফিট) মেনে চলার উপর।

তারপর যেকোন সাধারণ সাবান দিয়ে হলেও বার বার হাত ধোয়ার উপর।

হাঁচি, কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে দেয়া। তার জন্য টিস্যু বা হাতের কনুই দিয়ে মুখ ঢেকে নেয়া যেতে পারে।

করোনার কোন সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, প্রতিষেধক নেই। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মাধ্যমে প্রতিরোধই একমাত্র উপায় করোনা থেকে মুক্ত থাকার।

আমাদের দেশের জনগণ মাশাল্লাহ খুব সচেতন, সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে জনগণ যেন বাসায় থাকে।

কিন্তু আমরা সবাই ঈদের ছুটি মনে করে শপিংমল গুলোতে ভীড় করছি। ঈদে নতুন জামা, জুতো চাই-ই চাই। করোনা হোক চা-ই কি ঈদের দিন আইসিইউতে থাকতে হোক, তাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু ঈদের শপিং না করে বাসায় থাকা কোনভাবেই পসিবল না।

রাস্তায় অন্যান্য বছরের মতোই জ্যাম লেগে আছে। ঈদে ঘরমুখো মানুষের স্রোত শুরু হয়েছে।

আমাদের এইসব কর্মকাণ্ড দেখে করোনাও খুব খুশি মনে সবার শরীরে বাসা বাঁধছে।

যেখানেই ভীড় দেখছে সেখানেই করোনা বলছে আহো, ভাতিজা আহো! প্রতিদিন বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা, প্রতিদিন বাড়ছে করোনায় মৃতের সংখ্যা তবু আমাদের হুঁশ নেই।

আমাদের কান্ডজ্ঞান নেই, কান্ডজ্ঞান তো দূরের কথা আমাদের পাতার জ্ঞান-ই নেই। এসব করে করোনার সংক্রমণ বাড়াচ্ছি নিজেরাই।

কিন্তু যখন কেউ করোনা পজিটিভ হয়েছে শুনছি ,তখন সবাই মিলে তাকে সমাজচ্যুত করি। সমাজের সবাই করোনা আক্রান্ত রোগীদের সাথে এমন অমানবিক আচরণ করি যেন সে কোন পাপ করেছে।

করোনা আক্রান্ত রোগীকে বাড়িওয়ালা বাড়ি থেকে বের করে দেয়, এলাকাবাসী তাদের একঘরে করে দেয়, এলাকা ছাড়ার জন্য হুমকি-ধমকি দেয়। করোনায় রোগী মারা না গেলেও মানুষের অমানবিক আচরণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পরে।আত্মহত্যার মতো পথ ও বেছে নিতে পারে।

আমার ভুলে আজ অন্য কেউ করোনা পজিটিভ। আগামীকাল আমিও করোনা পজিটিভ হতে পারি।

করোনা কোন পাপের ফল নয়। করোনা সামাজিক দূরত্ব মেনে না চলা, স্বাস্থ্য বিধি না মেনে চলার ফল।

করোনা রোগী সুস্থ হয়ে যায়। তাকে সুস্থ হওয়ার জন্য সুযোগ দিতে হবে। তার সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে। তাকে মানসিক সাপোর্ট দিতে হবে। তাকে সাহস দিতে হবে। তার ও তার পরিবারের খোঁজ নিতে হবে।

অবশ্যই তার সাথে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে তবে তার সাথে অমানবিক আচরণ করা যাবেনা।

আমাদের দেশের জনগণ করোনা রোগীদের সাথেই শুধু অমানবিক আচরণ করে ক্ষান্ত হয়না। তারা করোনা রোগীদের সেবা দানকারী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথেও অমানবিক আচরণ করেছে।

চিকিৎসকদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। বাড়ি ভাড়া দিবেনা বলেছে। নার্স এর বাড়ির লোকজনকে জিম্মি করে রেখেছে। চিকিৎসকের বাড়ির লোকজন করোনা পজিটিভ হওয়ায় বাড়িতে ঢিল ছুঁড়েছে।

করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য হাসপাতাল করার উদ্যোগ নিলে সেখানে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করেছে।

করোনায় মারা গেলে লাশ বহন করার জন্য খাটিয়া দেয় নাই। অনেক জায়াগায় এলাকায় লাশ দাফন করতে বাধা দিয়েছে। পুলিশ এসে লাশ দাফন করার ব্যবস্থা করেছে। লাশ দাফনে কেউ এগিয়ে আসে নাই।

আল মারকাজুল বা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম আর কিছু স্বেচ্ছাসেবক যদি এগিয়ে না আসতো, তাহলে করোনা বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের লাশ হয়তো দাফনই হতোনা।

এ কোন দেশে বাস করি আমরা, আমরা কেমন মানুষ? আমরা এত অমানবিক হওয়ার পর নিজেদের মানুষ বলি কি করে? মানবিক হোন, মানবিক গুণাবলির চর্চা করুন। করোনা রোগীদের সাথে মানবিক আচরণ করুন। করোনা প্রতিরোধে ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন।