গল্প আড্ডা

হারিয়ে যাওয়া ঈদ

ডা. এজাজ বারী চৌধুরী (ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, সিটি হাসপাতাল লিমিটেড, লালমাটিয়া):

আমাদের সময় ঈদের দশদিন আগে থেকেই ঈদের উত্তেজনা এবং আনন্দ শুরু হতো৷ নিজে থেকেই লিষ্ট বানাতাম৷ জামা, প্যান্ট, জুতা, টুপী, আতর, পিস্তল, গাড়ী আর বিভিন্ন রকম পটকা৷ পটকাকে আমরা বলতাম বোম৷ সিগারেট বোম, চকলেট বোম, ছুঁচো বোম, কলসি বোম ইত্যাদি৷ আর থাকতো তারাবাজি৷ দুই ভাইয়ের লিষ্ট প্রায় একই থাকতো, বোনেরটা হতো আলাদা৷ ইচ্ছে করেই লিষ্টগুলো বড়ো করতাম, যেন কাঁটছাঁটের পরও আসল শখগুলোকে টিকিয়ে রাখা যায়৷ তারপর শুরু হতো ঠেলাঠেলি, লিষ্টগুলো আব্বুকে কে দেবে বা কিভাবে দেয়া হবে? বেশীরভাগ সময়ই আব্বুর নজরে পড়ে এমন যায়গায় লিষ্টগুলো চাপা দিয়ে আমরা সবাই হাওয়া হয়ে যেতাম৷

আব্বুও কম মজা করতো না৷ সব কিছু নজরে পড়লেও লিষ্টগুলো যেন তার কাছে অদৃশ্য হয়ে থাকতো৷ আমরা উশখুশ করতাম৷ একসময় সামনে দিয়ে ঘনঘন যাওয়া আসা শুরু করতাম৷ দেখা গেলো আব্বু কিছু চাইলে, সেটা এনে লিষ্টের পাশে রাখতাম৷

একসময় আব্বুর ডাক পড়তো… এগুলো কি? সেটা আরেক মজার পর্ব ছিলো৷ ছোটখাটো যুদ্ধ হতো, দাবী দাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে সেগুলোর অনুমোদন নিতে৷ অনেককিছু কাটা গেলেও, আমাদের আসল দাবীদাওয়া গুলোতে ছাড় দিতাম না৷

ঈদে আমাদের সবচেয়ে বড়ো আনন্দ ছিলো পটকা ফোটানো আর গান শোনা৷ ঈদ উপলক্ষে পছন্দের গান বেছে বেছে ক্যাসেট রেকর্ডিং করতাম৷ আমি আর আমার ছোটভাই অন্তত পাঁচ ছয়টা ক্যাসেট রেকর্ড করাতাম দোকান থেকে৷

ঈদের চাঁদ দেখে যে কি পরিমান আনন্দ আমরা পেতাম, এখনকার প্রজন্মের কাছে সেটা হয়তো অবিশ্বাস্য৷ কোলাকুলি, চিৎকার, চেচামেচি, লাফালাফি, দৌঁড়াদৌঁড়ি, পটকা ফুটানো…. নিজেদেরকে জড়িয়ে ধরে নাচানাচি কতো কিছুই না আমরা করতাম! ঈদের চাঁদ আমাদের ঈদের খুশীর সবচেয়ে বড়ো অংশ ছিলো৷ তারপর টিভিতে শুরু হতো, “রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ”৷ গানটা যেন টিভিতে না, আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে বাজতো… আর সারা শরীর-মনে বয়ে যেতো আনন্দের শিহরন৷

আমরা দুই ভাই যখন পটকা ফুটানো আর গান বাজানোয় ব্যস্ত, আমার বোন তখন মেহেদি দিয়ে হাত রাঁঙাতো৷ নিজেরটাই শুধু না, আমাদের দুই চাচাতো বোনকেও মেহেদি পরিয়ে দিতো৷

রাত ১১টা থেকেই বাড়ীতে সেমাই পায়েসের গন্ধ মৌ মৌ করতো৷ আমার আম্মা সেমাই, পায়েস, ডিমের হালুয়া, পুডিং, মুরগীর রোষ্ট ইত্যাদি রাতেই রান্না করতেন এবং এগুলো শেষ করতে করতে রাত তিনটার বেশী বেজে যেতো৷ আমরাও জেগে থাকতাম, হৈ চৈ খেলাধূলা নিয়ে৷

ঈদের নামাজ শেষ হবার পর থেকেই মনে হতো এবার সারা দিন ফ্রি, শুধু আনন্দ করবো৷ মসজিদে কোলাকুলি শেষ করে প্রায় দৌড়ে বাসায় আসতাম এবং শুরুতেই আব্বু আম্মুকে সালাম করে, সালামীর জন্য আব্দার করতাম৷ চকচকে দুই টাকা, পাঁচ টাকা কিংবা সর্বোচ্চ দশ টাকা পেয়েই এতো খুশী হতাম… যেনো সাত রাজার ধন পেয়েছি৷ সারাদিন সব আত্মীয় স্বজনকে সালাম করে যদি ৫০ টাকাও হতো, নিজেকে মনে হতো আস্ত একটা ব্যাংকের মালিক৷

ক্যাডেট কলেজ থেকে বইয়ের বস্তা নিয়ে আসতাম বাসায়৷ নিজের চেয়েও ওজন বেশী হয়ে গেলেও মনে হতো, আরো অনেক বই তো বাদ পড়ে গেলো৷ এবার রোজার ছুটিতে এমন পড়া দেবো!!! অথচ দেখা যেতো বেশীরভাগ বই বেরই করা হতোনা৷ বাসায় আসার সময় আফসোস করতে করতে আসতাম, আরো বই আনা হলোনা বলে…. আর ক্যাডেট কলেজে ফেরার সময় আফসোস করতে করতে ফিরতাম, অর্থহীনভাবে এতো বই টেনে আনার জন্য!

একবার ঈদে চকলেট বোম ফোটানোর সময় আবিস্কার হলো, যদি কোন টিনের কৌটা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়, তাহলে বোমটা ফোটার সময় সেই কৌটাটা অন্তত দুই তিন তলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচুতে উঠে যায়৷ এটা আবিস্কারের পর আমাদের আনন্দ যেমন বহুগুন বেড়ে গেলো…. ঠিক তেমনই আম্মার রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় সমস্ত টিনের কৌটাই গায়েব হয়ে যেতে থাকলো৷ টিনের কৌটা খুঁজে বেড়ানো, আমাদের আরেকটা মিশনে পরিনত হলো৷

আরেকবার ঈদের দিন দুপুর বেলা আমি এক দুঃসাহসিক কাজ করলাম৷ আব্বু ঘুমাচ্ছিলো৷ আমাদের মাইক্রোবাসের চাবিটা গোপনে নিয়ে আমি মাইক্রো নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে গেলাম৷ আমার পাশে বসলো আমার ছোট ভাই৷ বলে রাখি, আমি তখন কেবল কয়েকদিন মাঠে ড্রাইভিং করেছি, রাস্তায় গাড়ী চালানোর কোন অভিজ্ঞতাই ছিলোনা৷ তারপরো গাড়ী নিয়ে সারা শহরে ঘুরে বেড়ানো এবং অবশেষে কোন অঘটন ছাড়াই বাড়ী ফিরে আসা…. ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে৷

আর আমার আব্বু? দীর্ঘ এগারো বছর ধরে কবরবাসী৷ লিষ্ট দেয়া, লিষ্ট নিয়ে খুনসুটি, একসঙ্গে ঈদের কেনাকাটা, একসঙ্গে নামাজ পড়তে যাওয়া, ফিরে এসে সালাম করে সালামী নেয়া…. সবই কেবলই বেদনার স্মৃতি৷ এখন বরং আমরা ঈদের নামাজ পড়েই গোরস্থানে যাই, আব্বুকে সালাম জানাতে৷ আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আব্বুকে ঈদ সালামী দিতে!

এবারের ঈদে তো আম্মাকে সালাম করা বা ভাইয়ের সাথে কোলাকুলি করাটাও ভাগ্যে হলোনা৷ প্রতিবছর মাত্র দুই ঈদে কুষ্টিয়া যাই…. শত ভোগান্তিকে মাথায় নিয়েও৷ আর এবার এতোবড়ো ছুটিতেও পরিবারের সাথে দেখা পর্যন্ত হলোনা!

॥ শেষ কথা ॥

এই লেখাটা লেখার সময়ও আমার ছেলে আমার ঘাড়ে চড়ে বসেছে, আমার মুখের ভেতর তার আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে মজা করে হাসছে৷ আমার লেখার মধ্যে অন্য অক্ষর টাইপ করে আমাকে বিরক্ত করছে, আর আমার বিরক্ত হওয়া দেখে হাসছে৷ আমার কান টানছে, চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দিচ্ছে…. আরো কতো কি?! আমি কপট রাগ দেখিয়ে ধমক দিচ্ছি…. যেটা দেখে সে আরো মজা পেয়ে হো হো করে হাসছে! এবং উৎসাহে তার দুষ্টুমীর পরিমান আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে৷

আমরা বড়ো হয়েই ভুলে যাই, একদিন আমরাও ছোট ছিলাম৷ আমার ছোট সন্তানরা যে দুষ্টুমীগুলো করে এখন মজা পায়, আনন্দ পায়, একদিন আমিও সেগুলো করেই মজা পেতাম, আনন্দ পেতাম৷ অথচ এখন বড়ো হয়ে আমরা সেগুলো মানতে চাইনা, শাসন দিয়ে তাদের স্বতস্ফূর্ত আনন্দে বাধা দিই৷ আবার এটাও চিন্তা করিনা, বড়ো হয়ে গেলে আমার সন্তান চাইলেও আর এভাবে আনন্দ করতে পারবেনা, তার ব্যক্তিত্ব এবং মন মানসিকতা পাল্টে যাবে বলে৷

এখন আমি আমার ছেলেবেলাকে কতোই না মিস করি…. কিন্তু আমি চাইলেও ছেলেবেলার সেই দুরন্তপনা গুলো করে এখন আনন্দ নিতে পারবোনা বা আমার আনন্দ আসবেও না৷ আমার সন্তানদের আনন্দ গুলোই আমাকে আনন্দ দেয় এবং আমাকে আমার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যায়!

ঈদ এখন শুধুই একটা ছুটির দিন৷ দল বেঁধে আত্মীয় স্বজনের বাসায় বেড়ানোও খুব একটা হয়না৷ তবুও স্বপ্ন দেখি, একদিন হয়তো আবার সেই আনন্দের ঈদ ফিরে আসবে! ঈদ মোবারক!!!