গল্প আড্ডা

কোথায় হারালো সেই ঈদ

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ :

তখন আমি ক্লাস টু তে পড়ি।
সময় ১৯৯২
সবুজ শ্যামল ছোট্ট আমাদের গ্রাম।
গ্রামের নাম বোয়ালিয়া।
এই গ্রাম পরিচিত ছিলো দুই কারণে।
এক আমাদের মাদ্রাসা, দুই আমাদের দাদাভাই।
বোয়ালিয়ার মাওলানা সাহেবকে সবাই চিনতো।

আমাদের বড় সংসার।
দাদাভাই হেড অব ফ্যামিলি।। বুবু আমাদের মায়ার জগৎ।
৬ ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে আমাদের দাদাভাই বুবুর সোনালী সংসার।
নাতি পুতি নিয়ে মোট ত্রিশজন আমরা।
আজ সোনার মানুষগুলো হারিয়ে গেছে না ফেরার দেশে।।
ঈদের আগের দিন বিকেল থেকেই আমাদের আনন্দ শুরু।
চাঁদ দেখার আনন্দ।
বাড়ির অন্য ফুফু কাকাদের সাথে আমরা ছোটরা চাঁদ দেখতে যেতাম।
বাড়ির উত্তরে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের উপর যে নীল আকাশ, সেখানে আমরা চাঁদ দেখতাম।
চিকন সরু সুতার মত চাঁদ।
চাঁদ দেখে আমরা আনন্দে ছোট ছোট বাচ্চারা লাফালাফি করতাম।।
চিৎকার দিতে দিতে আম্মাকে এসে জড়িয়ে ধরতাম।
বুবুকে গিয়ে এত বড় খবরটা দিতাম।
চাঁদ উঠেছে।
আগামীকাল ঈদ।।

ঈদের আগের দিন দাদাভাই ঈদ শপিং করতেন।
কোন কোন ঈদে আমরা শপিং লিস্টে থাকতাম যদি বিদেশী কাকাদের অনুগ্রহ হতো।
আবার কখনো আমাদের ঈদগুলো মলিন পোশাকে হতো।
আমরা কেন জানি বঞ্চিত হতাম।
একবার এক ঈদে আমার বড় বোন একটা জামার জন্য কি তার কান্না।
কিন্ত কেউ তাকে একটা জামা কিনে দেয়নি।।
থাক সেসব কথা।

আমার নানাভাই গরীব মানুষ ছিলেন।
আব্বা নানাভাই এর মুখ রক্ষা করতে আম্মার জন্য একটা শাড়ি কিনে আনতেন।
জনি প্রিন্ট শাড়ি।
শাড়ি এনে বলতেন, নানা ভাই দিয়ে গেছেন।
আম্মার মুখে স্মৃত হাসি ফুটে উঠতো।।
যৌথ পরিবারে নিজ বউ এর জন্য আলাদা একটা সস্তা শাড়ি কিনাও এক ধরনের অপরাধ।
আমার বাবা তখন শিক্ষক। ইনকাম কম। তিন হাজার টাকা বেতন।
সংসারে আব্বার শ্রম আছে, দায়িত্ব পালন করেন কিন্ত টাকা তো দিতে পারেন না।
তবে যেসব কাকারা বিদেশে থাকতেন, উনাদের পরিবার ও সন্তানদের ঈদ শপিং হতো।।
আমরা তাদের সুন্দর সুন্দর পোশাক এর পাশে মলিন ও বেমানান থাকতাম।।

আব্বাকে তো কখনো কোন ঈদে নিজের জন্য কিছু কিনতে দেখিনি।
কোন কোন ঈদে একটা নতুন লুঙ্গি এই যা।

ঈদের দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরা নামাজ পড়তাম আব্বার সাথে।
তারপর আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে যেতাম।
কবরে শুয়ে আছেন আমাদের পূর্ব পুরুষরা, অনেক আত্মীয়জন।
সবাই কুরআন পড়তো।
কবর জিয়ারত করতো।
যার যার বাবা, দাদা, দাদীর কবরের সামনে তারা বসতেন।

তারপর দাদাভাই এর জন্য অপেক্ষা।
গ্রামের অন্য মানুষরাও আসতেন।
দাদাভাই এসে মুনাজাত দিতেন।
সবাই হু হু করে কেঁদে উঠতো।
আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতাম।।
মুনাজাত দিয়ে দাদাভাই সহ আমরা যেতাম কবরস্থানের পাশেই আমাদের বড় ফুফুর বাড়ি।।
সেখানে সবাইকে সেমাই দেওয়া হতো।।

আমরা বাড়ি আসতাম।
এসে ঈদ সেলামির জন্য বুবুর কাছে ঘ্যানঘ্যান করতাম।
দাদাভাই কোন কোন ঈদে আমাদেরকে নতুন দুই টাকা করে দিতেন।
সেই দুই টাকার কড়া একটা নোট আমাদের কি আনন্দ দিতো তা আজ প্রকাশ করে বুঝানো যাবে না।
কখনো যদি বিদেশী কাকারা দেশে ঈদ করতেন, উনারাও দুই টাকা করে দিতেন।।
কি আনন্দ।।

সারাদিন পরে কে কত টাকা পেলাম তার একটা ভাবগাম্ভীর্য আলোচনা হতো।
কারো ৬ টাকা, কারো ৮ টাকা।
এক ঈদে আমি মোট ১২ টাকা ঈদি পেয়েছি।।

তারপর ঈদের নামাজে যাবার প্রস্তুতি।।
পুকুরে কি দপাদপি কর‍তাম আমরা।
পানি নিয়ে জলকেলী খেলা।। চিৎকার, চেচামেচিতে পুকুর সরগরম হয়ে উঠতো।।
পুকুর এর পানির ঢেউয়ে আমাদের ছোট মনের আনন্দ ছড়িয়ে যেত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

গোসলের পর আমরা আব্বার হাত ধরে ঈদগাহে যেতাম।
আমাদের ঈদগাহে দাদাভাই ছাড়াও জৈনপুরের পীর সাহেব হুজুররা ইমামতি করতে আসতেন।
কত মানুষ আসতো ঈদগাহে।।
সাদা পাঞ্জাবি, আতর এর সুবাসে চারপাশে ঈদ আমেজ।

ঈদের নামাজের পর মানুষ টাকা দিতো।
খুতবা দিতেন দাদাভাই।
তারপর মুনাজাত।।
আমি না টাকা গুলোর দিকে লোভাতুর চোখে তাকিয়ে থাকতাম।
ইশ দাদাভাই যদি দশটাকার একটা নোট দিয়ে দিতেন।

বাড়ি ফিরে খাওয়ার পালা।
বুবু আমাদের টিনের দোচালা ঘরে খাবার দিয়ে যেতেন।
আম্মা আমাদের সবাইকে লোকমা দিয়ে খাইয়ে দিতেন।
আমাদের সবার খাওয়ার পর আম্মার ভাগে কি থাকতো খেয়াল করিনি।।

তারপর ঈদি নিয়ে আমরা দোকানে যেতাম।
রাজা কন্ডম কিনতাম বেলুন হিসেবে।
কন্ডমের ভেতর যে অয়েল থাকে তাকে আমরা ব্যাঙের মুত বললাম।
সেটা পুকুরের পানিতে ধুয়ে নিয়ে বেলুন ফুলাতাম।
বাঁশি কিনতাম।।
সারাদিন দুপুর বিকাল আমরা পাড়া বেড়াতাম।

ছোট্ট কিশোর মনে সামান্য একটা রাজা কন্ডমের বেলুন ফুলাতে পারলে আমরা সুখী হয়ে যেতাম।

দিন গুলো হারিয়ে গেছে।
মানুষ হারিয়ে গেছে।
সেই কৈশোরের ঈদ আনন্দ আজ আর নেই।
কতকাল আর বাড়ির উত্তরের খোলা মাঠের উপর যে নীল আকাশ সেখানে আর চাঁদকে খুঁজতে যাইনা।।
চাঁদ দেখতে পেয়ে এত বড় খবরটা দিতে দৌড়ে এসে আম্মাকে জড়িয়ে ধরা হয়না।।
সেই দুই টাকার ঈদি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হইনা আর।।

এবারের ঈদও অন্যরকম।
এমন ঈদ আর আসেনি আমাদের জীবনে।
এমন ঈদ আর না আসুক আমাদের জীবনে।

আমার চিকিৎসক জীবনের অনেক ঈদ ই কেটেছে আমার রোগীদের সাথে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার পাশে বসে ছিলাম একা আনমনে।
দূরের গাঁয়ের সবুজ দেখলাম।
ছোট্ট মেয়েটার চেহারা ভেসে উঠায় চোখ ভিজে অশ্রু নামলো।
আমাকে ছাড়া আমার মা বাবার ঈদ কেমন কাটে?
আহা জীবন। আহা দায়িত্ব।

আজকের ঈদ আনন্দ একজন হার্ট এ্যাটাক করা রুগীর বুকের তীব্র ব্যাথা কমাতে পারায়।
মসজিদে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়া শিশুকে চিকিৎসা দিতে পারায়।
সারাদিনে এমন অনেক গল্প তৈরি হবে।।

তবু ভালো থাকুক মানুষ।
ভালো থাকুক প্রিয় বাংলাদেশ।।