ডাক্তারি পরামর্শলীড

কভিড-১৯ ও ডেক্সামেথাসন ঝুঁকি

ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ :

এক বন্ধু বেশ উত্তেজিত ও উচ্ছ্বসিত হয়ে কল করে বলল, চার পাতা ডেক্সামেথাসন কিনে বাসায় রেখেছে। জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

বন্ধু অবাক হল মনে হয়। বলল, করোনার চিকিৎসায় নতুন ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে জানো না? বিবিসি তো রিপোর্ট করেছে।

সঙ্গে সঙ্গে বিবিসি বাংলার রিপোর্টটি মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিল।

রিপোর্টটির হেডলাইন অবশ্য চমকপ্রদ- ‘করোনা ভাইরাস: কোভিড-১৯ এর জীবন রক্ষাকারী প্রথম ওষুধ ডেক্সামেথাসোন’। এই কথা শোনার পর যে কেউ বাঁচার জন্য এই ওষুধের জন্য মরিয়া হতেই পারেন। প্রথম আলো তো ক্যাচি হেডলাইন করাতে আরো মুন্সিয়ানা দেখিয়ে লিখেছে, ‘করোনার চিকিৎসায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ পাওয়া গেছে: বিবিসি’।

শিরোনামে যাই লিখুক, বডিতে কিন্তু আসল কথাটাই লিখেছে বিবিসি। এতে লেখা হয়, ‘এই ওষুধ ব্যবহার করলে ভেন্টিলেটারে থাকা রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি এক তৃতীয়াংশ কমানো যাবে। আর যাদের অক্সিজেন দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার এক পঞ্চমাংশ কমানো যাবে।’

বৃটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দাবি করেছেন, যেসব রোগী ভেন্টিলেটারে ছিলেন তাদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি এই ওষুধ নেবার ফলে ৪০% থেকে কমে ২৮%এ দাঁড়ায়। কিন্তু ডেক্সামেথাসন কোন রোগীর বেলায় প্রযোজ্য সে বিষয়ে লিখেছে, প্রতি বিশজন করোনা আক্রান্তের মধ্যে প্রায় ১৯ জনই সুস্থ হয়ে ওঠেন যাদের হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজনই হয় না।

যাদের হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়, তাদের মধ্যেও অধিকাংশই সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছু কিছু রোগীর প্রয়োজন হয় অক্সিজেন চিকিৎসা অথবা কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেবার জন্য ভেন্টিলেটার লাগাতে হয় কারো কারোর। এই উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের জন্যই ডেক্সামেথাসোন সাহায্য করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এইটুকু পড়ার পরে আর কারো বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে ডেক্সামেথাসন আগাম কিনে ঘরে রাখার মত ওষুধ নয়।

কিন্তু সমস্যা হল, সবাই তো আর রিপোর্ট পড়েননি। অনেকে শুনে শুনেই কিনে ফেলেছেন ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট।

ডেক্সামেথাসন বহু পুরানো ওষুধ। এটি এক ধরনের স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ (Corticosteroid).
১৯৫৭ সালে তৈরি হলেও এই ওষুধটি ব্যবহারের অনুমতি মেলে ১৯৬১ সালে। প্রায় ৬০ বছর ধরে চিকিৎসকরা বহু রোগের চিকিৎসায় এই ওষুধটি ব্যবহার করে আসছেন। বাত জাতীয় রোগে, এলার্জিতে এমন কী কিছু অপারেশনের ফোলা কমাতে ডেক্সামেথাসনের ব্যবহার অনেকটা কমন বলা যায়।

ফুসফুসের কিছু সমস্যা ও ব্রঙ্কোস্প্যাজমজনিত শ্বাসকষ্টেও এই ওষুধটি আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আইসিইউতে সিরিয়াস রোগীদের চিকিৎসায় স্টেরয়েডের ব্যবহারও নতুন নয়। এমন কী বাংলাদেশে কভিড চিকিৎসায় শুরু থেকেই ক্ষেত্রবিশেষে ডেক্সামেথাসন ব্যবহার করেছেন বলে আইসিইউতে দায়িত্বরত অনেক চিকিৎসক বলেছেন।

কিন্তু ডেক্সামেথাসন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করার মত কোন সাধারণ ওষুধ নয়।
ওষুধটি বহু রোগের যেমন মহৌষধ, তেমনি হতে পারে নানাবিধ ক্ষতির কারণও। স্টেরয়েড একদিকে যেমন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, অন্যদিকে এর ভুল প্রয়োগ হতে পারে মৃত্যুর কারণও। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দরকার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। কিন্তু ডেক্সামেথাসন আবার সেই ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কারো সিস্টেমিক ফাংগাল ইনফেকশন থাকলে তাকে ডেক্সামেথাসন দিলে ঘটতে পারে বড় ধরনের বিপর্যয়।

তাই শুধুমাত্র একজন চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন রোগীকে কোন অবস্থায় কতটা বেনিফিট পেতে কতটা ঝুঁকি নিয়ে এই ওষুধটি দেবেন।

আমার বন্ধু ডেক্সামেথাসন সম্পর্কে কিছুটা ধারনা পাওয়ার পর মন খারাপ করে বলল, এতোগুলা ওষুধ এখন কী করব?
বললাম, যে ডিসপেনসারি থেকে এনেছ, ওদের ফেরত দাও। অথবা এটা ফেরত দিয়ে প্রয়োজনীয় অন্য কোন ওষুধ নাও।

যারা ইতিমধ্যেই ডেক্সামেথাসন কিনে ফেলেছেন, তাদের জন্যও একই পরামর্শ। আর যারা কিনেননি, তারা ভুলেও আর কিনতে যাবেন না।

মনে রাখবেন, এই ডেক্সামেথাসন নিতে চাইলে প্রথমে আপনার কভিড হতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে। তখন প্রয়োজন হলে চিকিৎসকই দেবেন। এ নিয়ে রোগীর না ভাবলেও চলবে।

লেখক : ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ
সহকারী অধ্যাপক
ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়