ডাক্তারি পরামর্শ

করোনা প্রতিরোধ, কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও প্রতিকার

ডা. আফতাব হোসেন:

হঠাৎ ওয়াশ রুমে গো গো শব্দ শুনে চমকে উঠি। মনে হয় কেউ যেন বমি করছে। এই ওয়াশ রুমে গিন্নী ছাড়া অন্য কারও যাওয়া বারণ। কিন্তু তাঁর তো এই বয়সে বমি হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাহলে? পেট খারাপ করেনি তো? করোনাকালের এই দুঃসময়ে এতটাই সন্ত্রস্ত থাকি যে, কেউ একটা হাঁচি দিলেও ভয়ে কেঁপে উঠি। আমি ত্রস্ত পায়ে ওয়াশ রুমে যাই। দেখি এক মগ পানি নিয়ে গিন্নী প্রবল বিক্রমে গড়গড়া করছে। এমন ভাবে করছে যেন শুধু গলা নয়, পারলে পেটের নাড়ী ভুঁড়িও ধুয়ে বের করে নিয়ে আসে। ফলে গ্যাগ রিফ্লেক্সের জন্য ওক উঠে বমির মতো শব্দ হচ্ছে।

বউ আমার ভীষণ সুচবায়ীগ্রস্থ মানুষ। কোনো কাপড় একবার পরলে সাবান দিয়ে না ধুয়ে পরে না। মানুষ সাবান কেনে একটা দুইটা, সে কেনে এক ডজন, দুই ডজন। গুড়ো সাবান একবারে আধা মণ। তাঁর এই বাতিকের ঠেলায় আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। তাই সুযোগ পেলে খোঁচা মারার লোভ সামলাতে পারি না। কপট গম্ভীর স্বরে বলি,

– কী করছ? সাবান পানি দিয়া গলা পেট ধুচ্ছ নাকি?

– দেখো, ফাইজলামী করবা না। লবণ গরম পানি দিয়া গড়গড়া করতেছি।

শুনে হা হা করে উঠি আমি,

– সে কী? গলায় ব্যথা? জ্বরটর আছে নাকি? করোনায় ধরে নাই তো?

– আমারে করোনায় ধরলে তো তোমার পোয়া বারো। কিছু বুঝি না মনের করছ? আমি মরে গেলে তো আর একজন কারীনা আইনা হাজির করবা।

– পোড়া কপাল আমার। এই জীবনে একজন কারীনা বিবিই সামলাইতে পারলাম না! আরও? এখন ঐ জীবনে সত্তর জন কারীনার স্বপ্ন দেখা ছাড়া উপায় নাই।

– সেই সুযোগও তোমারে দিব না। এই জীবনে তো ছাড়বই না, ঐ জীবনেও না। করোনায় যাতে না ধরতে পারে তাই গরম পানি দিয়া গড়গড়া করতেছি। নাকও ধোবো।

– কও কী? গরম পানি দিয়া গলা নাক ধুইলে করোনায় ধরবে না, এইটা কই পাইলা?

– ক্যান? ফেসবুকে! সেদিন তো দেখলাম, তোমার এক বন্ধুও লিখছে, পোভিডন আয়োডিন না কি কয়, তাই দিয়া গড়গড়া করতে ও নাক ধুইতে। তুমি এক ডজন পোভিডন আইনা দিও। শেষে আবার শেষ না হইয়া যায়।

শুনে মনে মনে শিউরে উঠি আমি। খাইছে! এই খবর ভাইরাল হইলে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের মতো পোভিডন আয়োডিনও আউট অফ স্টক হইয়া যাইবে। সহজ সরল বউটাকে আমি দোষ দিতে পারি না। সাঁতার না জানা বালক যখন স্রোতের টানে ভেসে যেতে থাকে, তখন বাঁচার জন্য খড় কুটাও আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে। আর এখন তো মানুষ অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়ছে। বাঁচার জন্য একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শকে সে তো দেববাক্য মানবেই। ফেসবুকে লিখতে পয়সা লাগে না। তাই বিশেষজ্ঞ এবং বিশেষ ভাবে অজ্ঞ, সবাই যে যেমন পারে পরামর্শ দিচ্ছে, আর মানুষ ডান বাম না দেখে গো গ্রাসে তা গিলছে। এতে যে কুমিরের শিয়ালের ঠ্যাং ছেড়ে লাঠি ধরার মতো অবস্থা হতে পারে, ভেবে দেখছে না। আমি বউটাকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসি। পাশে বসিয়ে বলি,

– শোনো, গরম লবণ পানি কিংবা পোভিডন আয়োডিন মিশ্রিত পানি দিয়া গড়গড়া করলে কিংবা নাক ধুইলে মুখ ও নাক পরিষ্কার হয় ঠিকই, কিন্তু তাতে করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচবে, এমন কোনো প্রমাণ নাই। তবে যদি করোনায় আক্রান্ত হও, আর তাতে যদি গলা ব্যথা হয়, তাহলে গরম পানি ব্যথার উপশম করবে ঠিকই, কিন্তু করোনা ভাইরাসকে মারতে পারবে না।

– ক্যান? গরম পানি দিয়া গড়গড়া করলে ভাইরাস ধুয়ে যাবে না? মরে যাবে না? যে ভাবে সাবান দিয়া হাত ধুইলে ভাইরাস ধুয়ে যায়, মরে যায়?

– না। করোনা তো আর গরুর গোসতের চর্বি না যে মুখে, গলায়, জমে থাকবে আর তুমি গরম পানি দিয়া ধুয়ে ফেলবে ! করোনা ভাইরাস মুখ, নাক ও চোখের মিউকাস মেমব্রেনের কোষের মধ্যে ঢুকে যায়। সেখান থেকে তাঁকে টেনে বের করা সম্ভব নয়। আর কিছু করোনা যদি হাওয়া খাওয়ার জন্য মিউকাস মেমব্রেনের উপর একটু বসেও থাকে, যে পরিমাণ গরম তোমার গলা সহ্য করতে পারবে, তা অনায়াসে করোনাও সহ্য করতে পারবে। সুতরাং এই গরম পানিতে তার সেদ্ধ হয়ে যাবার কোনো কারণ দেখি না।

– তুমি সব সময় একটু বেশি বুঝো। আচ্ছা, কও শুনি, তোমার মতে করোনার হাত থেকে বাঁচার উপায় কী?

– দেখো, করোনাকে প্রতিরোধ কিংবা প্রতিকার করার মতো কোনো ওষুধ এখনও আবিষ্কার হয়নি। সুতরাং প্রকৃতির এই অদৃশ্য শত্রুর আক্রমণ হতে বাঁচতে হলে তোমার শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অর্থাৎ শরীরের ইমিউনিটি বাড়াতে হবে। যা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তোমাকে রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

– কী ভাবে বাড়বে এই ক্ষমতা ?

– প্রথমত, তোমাকে সুষম খাদ্য খেতে হবে। প্রচুর পরিমাণে তাজা শাক সবজি ফল মুল খেতে হবে যাতে শরীরে ভিটামিনের অভাব না হয়। কারণ ভিটামিন শরীরের ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে। সাথে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, কলা, ডাল, বাদাম, যার যেমন সামর্থ্যে কুলায়। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত এক্সারসাইজ করতে হবে। এক্সারসাইজ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ওজন কমাতে সাহায্য করে। এখন করোনাকালে যেহেতু বাইরে বা জিমে যাওয়া সম্ভব নয়, ঘরে বসেই নিয়মিত এক ঘণ্টা, অথবা নিদেন পক্ষে অন্তত আধা ঘণ্টা ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে হবে। তৃতীয়ত, স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা শরীরের ইমিউনিটি কমিয়ে দেয়। তাই যতদূর সম্ভব, আনন্দে থাকতে হবে। রিল্যাক্স থাকতে হবে। ফেসবুকে উলটা পালটা গুজব পড়ে আতঙ্কিত না হয়ে টিভি দেখো, ইউটিউবে ভালো ভালো সিনেমা দেখো কিংবা বই পড়, মন প্রফুল্ল থাকবে।

– কিন্তু অনেকে যে জিংক খেতে বলে?

– ভালো প্রশ্ন করেছ। জিংক শরীরে ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে। রিসার্চে দেখা গেছে, কমোন কোল্ড বা সাধারণ সর্দি জ্বরের বেলায় জিংক তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে সাহায্য করে। জিংক সাধারণ সর্দি জ্বরের ভাইরাস, রাইনোভাইরাসের বংশ বৃদ্ধিতেও বাঁধা দেয়। কিন্তু জিংক করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারবে কিনা, কিংবা তাড়াতাড়ি সেরে উঠতে সাহায্য করবে কিনা, সে ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত নন। যারা সুষম খাবার খায়, তাদের শরীরে জিংকের অভাব হবার কথা নয়। তবে শিশু, বৃদ্ধ কিংবা যারা নানা রোগে আক্রান্ত, যারা সুষম খাবার খেতে পারে না, তারা জিংক সাপ্লিমেন্ট নিতে পারে। তবে তা প্রতিদিন ৪০ মিলিগ্রামের উপরে নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিংক শরীরের ক্ষতি করতে পারে।

– ভিটামিন সি?

– এটাও বডির ইমিউনিটির জন্য খুব জরুরী। প্রচুর শাক সবজি, ফল মূল খেলে ভিটামিন সি আলাদা করে খাবার দরকার নাই। তবে যারা এ সব খাবার খেতে পারে না, তারা প্রতিদিন একটা বা দুইটা ভিটামিন সি ট্যাবলেট খেতে পারে। মনে রেখো, ভিটামিনের কোনো ক্যালরি ভ্যালু নেই, অর্থাৎ কোনো শক্তি যোগায় না। অতিরিক্ত ভিটামিন জমাও থাকে না। তাই প্রয়োজনের বেশি খেলে শরীর তা বের করে দেয়।

– আর ভিটামিন ডি?

– এইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শরীরের ইমিউনিটির জন্য। অথচ এই ভিটামিন নিয়ে ফেসবুকে তেমন হইচই দেখি না। পুরুষেরা, যারা নিয়মিত রোদে যায়, তাদের ভিটামিন ডি এর অভাব হবার কথা নয়। কিন্তু যারা গাড়ি ছাড়া চলেন না, সারাদিন এসি রুমে বসে কাজ করেন এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মহিলারা, যাদের অনেকেই ঘরের বাইরে যায় না, আর গেলেও সমস্ত শরীর ঢেকে ঢুকে যায়, যাতে তাদের চামড়ায় রোদ লেগে কালো না হয়ে যায়, তাদের নিশ্চিত ভিটামিন ডি এর অভাব আছে। তাদের সবারই এক কোর্স ভিটামিন ডি খাওয়া উচিৎ।

– আর কোনো খাবার?

– একজন বিখ্যাত ব্রিটিশ নিউট্রিশনিস্টের মতে আদা, লবঙ্গ চায়ের সাথে, এক কোয়া কাচা রসুন, তরকারিতে হলুদ এবং ওরেগানো বা পুদিনা পাতা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

– তাহলে তো ভালোই। আমরা তো এগুলো খেতেই পারি। বেশি বেশি পানি খাওয়ার কি দরকার আছে ?

– না। বেশি পানি খেয়ে কোনো লাভ নাই। পরিমিত পানি খেলেই হবে।

– আর লক ডাউন, সামাজিক দূরত্ব, এ সব নিয়া কিছু বলবা না ?

– তার আর দরকার হবে না।

– মানে ?

– দেখো, মানুষের চরিত্র বড় জটিল। যদিও আমরা সবাই কম বেশি অদৃশ্য ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, তবুও তাঁর নির্দেশিত পথে চলি না। কারণ আমরা মনে করি, আরও তো অনেকদিন বেঁচে থাকব। শেষের দিকে নাহয় ধর্ম কর্ম পালন করে মাফ টাফ চেয়ে নেব। কিন্তু যখন বয়স বাড়ে, রোগে শোকে ধরে, দূরে মৃত্যুর পদধ্বনি শোনা যায়, তখন তাড়াতাড়ি ধর্মে কর্মে মনোযোগী হয়। করোনাও অদৃশ্য। মানুষ বিশ্বাসও করে। কিন্তু মনে করে, করোনা বোধহয় তাকে ধরবে না। গত তিন মাস ধরে লক ডাউন, সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্যবিধির কথা বলে বলে গলায় রক্ত উঠিয়ে ফেলেও কোনো লাভ হয়নি। এখন যে হারে করোনা শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে যখন দেখবে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু কিংবা প্রতিবেশী কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে কিংবা মারা গেছে,, তখন আর লক ডাউন লাগবে না। মানুষ এমনিতেই নিজেকে ঘরে লক আপ করে রাখবে।

– ঠিক বলেছ। আগে তাও বাজারে যেতে ইচ্ছে করত। যখন শুনলাম, আমাদের পাড়াতেই কয়েকজনরে করোনায় ধরছে, এখন তো জানালার কাছে আসতেও ভয় পাই।

– একজাক্টলী। তবে ভয় নাই। করোনার পা’ও নাই যে দরজা দিয়ে হেঁটে আসবে কিংবা পাখাও নাই যে জানালা দিয়ে উড়ে ঢুকবে। সুতরাং ঘরে থাকো। যা বললাম, মেনে চলো। করোনার হাত থেকে হয়ত এ যাত্রা বেঁচে যাবে।