গল্প আড্ডা

প্রথম চোর দেখা

ডা. সাঈদ এনাম :

আমরা যখন ছোট ছিলাম অর্থাৎ প্রাইমারীতে পড়তাম তখন এখনকার মতো এতো মোবাইল ফোন ছিলোনা, ইন্টারনেট ছিলোনা, ছিলোনা ফোর-জি বা টু-জি। তড়িৎ যোগাযোগে ল্যান্ড ফোন ছিলো পাড়ায় তাও একটি বা দুইটি বাড়িতে।

প্রথমে এক্সচেঞ্জ এ কল করতে হতো, পরে দরকারী বাসার নাম্বারটা বলতে হতো। তখন এক্সচেঞ্জার সাহেব সংশ্লিষ্ট নাম্বারে সংযোগ দিতেন।

তথাপি মোবাইল বা নেটওয়ার্ক না থাকলেও সে সময় মুহুর্তেই কিভাবে জানি এ পাড়ার মুখরোচক খবরা-খবর ও পাড়ার শিশু-কিশোররা জেনে যেতো।

তেমনি “একটা খবর”, এক সন্ধ্যায় আমাদের পাড়ার সবেমাত্র পড়ার টেবিলে বই নিয়ে বসা সকল কিশোরদের মধ্যে কিভাবে যেনো চাউর হয়ে গেলো।

“উত্তর পাড়ায় এক বাসায় নাকি চোর ধরা পড়েছে”।

ব্যাস, আর যায় কোথায়। যে যেভাবে পারে “লুকিয়ে-অলুকিয়ে” এক জোট হয়ে দে ছুট উত্তর পাড়ার সেই বাসায়, যেখানে চোরগুলোকে হাতেনাতে ধরে কিছুটা “আতিথেয়তা” করে বেঁধে রাখা হয়েছে।

এ শুনে কেউ আর বাদ যায়নি। উত্তর পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, পুর্ব ও পশ্চিম পাড়া- সব পাড়ার আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই ভীড় করে গোল করে দাঁড়িয়ে দেখছে চোরগুলোকে।

অবশেষে আমাদের পাড়ার সব শিশু কিশোররা মিলে কোনমতে ভিড় ঠিলে, “চিপাচুপা” দিয়ে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি চোরদের।

জীবনের এই প্রথম আমাদের চোর দেখা..!!!
সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি..!

তার আগে চোর দেখতে কি রকম হয়, এ নিয়ে ছিলো আমাদের মধ্যে রাজ্যের কৌতুহল আর ভয়। চোর সাদা না কালো, চিকন না মটু, লম্বু বা বেটে, দাড়িয়াল না মেছোওয়াল- এ নিয়ে ছিলো আমাদের মধ্যে তর্কাতর্কি।

প্রথমবারের মতো চোর দেখার রোমাঞ্চকর অনুভূতির কথা বলে শেষ করা যাবে না। সেই চোর দলের দু একজনের মুখাবয়ব এখোনও আমার মনে আছে।

“জীবনের আবেগময়, রোমাঞ্চকর অনুভূতির কথা মানুষের আজীবন মনে থাকে, কারন হরমোনের প্রভাবে এ ঘঠনা এবং ঘটনা সংশ্লিষ্ট চরিত্র গুলো খুব দৃঢ়ভাবে আমাদের ব্রেইনের মেমোরি সেন্টারে গ্রথিত হয়ে যায়, ফলে তা আর সহসা ভুলা যায় না”। অনেকটা শিল্পী সুবীর নন্দী গাওয়া সেই গান, “দিন যায় কথা থাকে….” গানটির মতো।

সবশেষে চোর দেখে ফেয়ার পথে আমরা কিছুটা মর্মাহত ছিলাম। চোরগুলো দেখতে আমাদের মতোই।
আমাদের মতো চোখ, কান, নাক, হাত ও পা।

অথচ চোরের চেহারা নিয়ে আমাদের কিশোর মনে তখন ছিলো নানান “ভৌতিক প্রতিচ্ছবি”। চোরগুলো দেখতে না জানি কোন ভুতের মতো।

সবচেয়ে আশ্চর্য হই আমরা সকল কিশোর, যখন দেখলাম, এই চোর দলের মধ্যে একটি চোর আমাদের খানিক পরিচিত। মাঝেমধ্যে একে আমাদের পাড়ায়, আড়ালে আবডালে ঘুরতে ফিরতে দেখতাম। আর একে দেখে তখন আমাদের মধ্যে কে একজন চিৎকার করে বলে উঠেছিলো,
“আরে এ’তো চোর নয়, এ আমাদের প্যাঁদা…”

ডা. সাঈদ এনাম
সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি বিভাগ,
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ।