ডাক্তারি পরামর্শলীড

ভিটামিন-ডি এবং করোনা ভাইরাস

ডা. অপূর্ব চৌধুরী, লন্ডন প্রবাসী :

শরীরে বিভিন্ন কাজের জন্যে হাজার রকম রাসায়নিক পদার্থের প্রয়োজন হয়। কোষের ভেতরে এমন অনেক কাজের জন্যে তেমন একটি বিশেষ উপাদানকে বলে- ভিটামিন।

ইংরেজিতে Vitamin। কিন্তু একসময় শব্দটি Vitamine লেখা হতো। একটি অতিরিক্ত E দেয়া হতো। কারণ – ১৯১২ সালে পোলিশ বায়োকেমিস্ট Casimir Funk যখন প্রথম ভিটামিন আবিষ্কার করেন, ধরে নিয়েছিলেন এটি Amonia থেকে উৎপত্তি হয় বলে amine গ্ৰুপের। শরীরের একটি দরকারি বা Vital elements মনে করা হয় বলে Vi + amine মিলে Vitamine নাম দেয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে জানা গেলো যে – ভিটামিন আসলে amine গ্ৰুপের নয়। তারপর থেকে অতিরিক্ত e বাদ দিয়ে লেখা হতে লাগলো – Vitamin!

শরীরে এমন ১৪ টি ভিটামিন দরকার হয়। ভিটামিন D তার একটি।

ভিটামিন D পাঁচ রকমের হলেও দুটি ধরন নিয়ে বেশি কথা হয়। D2 এবং D3। বাকিগুলো D1, D4 এবং D5।

D2 ভিটামিনের রাসায়নিক নাম Ergocalciferol। D3 ভিটামিনের নাম Cholecalciferol।

শরীরে ভিটামিন D -এর মূল উৎস ভাবা হয় সূর্যের আলো। অনেকে তাই Sunshine Vitamin বলে একে। সূর্যের আলো গায়ে এসে পড়লে UVB রশ্মি ত্বকের Epidermis স্তরে থাকা একধরনের কোলেস্টেরল 7-dehydrocholesterol -কে কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় লিভার এবং কিডনির সাহায্যে ভিটামিন D -তে পরিণত করে।

শরীরের এই উৎস ছাড়াও প্রাণী এবং উদ্ভিদ থেকে ভিটামিন D পাওয়া যায়। কোন ধরনের ফলে ভিটামিন D থাকে না। সবজির মধ্যে মাশরুম এবং সয়া থেকে বানানো Tofu -তে এই ভিটামিন থাকে। ডিমের হলুদ অংশ এবং বিফ লিভারে সামান্য ভিটামিন D আছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় স্যামন, সার্ডিন এমন মাছগুলোতে। অনেকদিন থেকে লোকেরা Cod মাছের লিভার থেকে তৈরি Cod liver oil ভিটামিন D -এর প্রধান সাপ্লিমেন্ট হিসাবে খেয়ে থাকে।

ভিটামিন D -এর ইন্টারন্যাশনাল ডেইলি RDA বা recommended dietary allowance হল – এক বছরের নিচে বাচ্চাদের ৪০০, এক থেকে সত্তর বছরের মধ্যে হলে ৬০০ এবং সত্তরের উপরে বয়স হলে ৮০০ IU বা International Units দরকার।

রক্তে ভিটামিন D পরীক্ষার নাম 25-hydroxy vitamin D test। ২০ থেকে ৫০ ng/mLধরা হয় ভিটামিন D -এর স্বাভাবিক মাত্রা।

১২ ng/mLএর নিচে হলে ধরা হয় এই ভিটামিনের প্রবল ঘাটতি আছে। এমন হলে বাচ্চাদের Rickets এবং প্রাপ্তবয়স্কদের Osteomalacia এবং Osteoporosis হয়।

৫০ ng/mL এর উপরে হলে ভিটামিন D Toxicity দেখা দেয়। এতে শরীরে ক্যালসিয়ামের আধিক্য দেখা দিয়ে কিডনি, হাড়সহ অনেক অংশের স্বাভাবিক কাজকে ব্যাহত করে।

ভিটামিন D -এর অনেকগুলো কাজ। কিন্তু শরীরে তার প্রধান কাজ হাড়ের গঠনে ঠিক রাখা। হাড় তৈরি, পুনর্গঠন এবং ঠিক রাখতে ক্যালসিয়াম একটি দরকারি উপাদান। ভিটামিন D ক্যালসিয়ামের শোষণ এবং রক্তে স্বাভাবিক পরিমাণটি নিয়ন্ত্রণ করে।

হাড়ের গঠনে সাহায্য করা ছাড়াও শরীরে ইনফেকশনের বিরুদ্ধে কাজ করতে ভিটামিন D সাহায্য করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় এটি পরিষ্কার হয়েছে যে- শরীরের ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন D -এর ভূমিকা আছে।

পরীক্ষায় দেখা গেছে- ইমিউনিটি সিস্টেমের অংশ T cell, B cell এবং Macrophage, তিনটির কাজে ভিটামিন D -এর দরকার হয়। সাথে এটাও দেখা গেছে যে- ভিটামিন D এর অভাবে Autoimmune diseases যেমন : আর্থাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এগুলো বৃদ্ধি পায়।

করোনা ভাইরাসের সাথে ভিটামিন D -এর সম্পর্কটা কি তাহলে?

সম্প্রতি জার্মানির স্টুর্টগার্ডে University of Hohenheim সহ ইংল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, আয়ারল্যান্ড সহ ইউরোপ, এশিয়া এবং আমেরিকায় ৮টি গবেষণা হয়েছে কোভিড-১৯ এর সাথে ভিটামিন D -এর সম্পর্ক নিয়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে ভিটামিন D -এর সাথে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সরাসরি কোন সম্পর্ক না থাকলেও ভিটামিনটির অভাবে অন্য আর কিছু শারীরিক সমস্যার উপস্থিতি ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়া এবং মুমূর্ষু হওয়া, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

তারমানে ভিটামিন D -এর অভাব পূর্ব থেকে থাকা রোগের সহযাত্রী হিসাবে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে। তাহলে ভিটামিন D বেশি করে খেলে কি ভাইরাসের আক্রমণ কমে? অথবা ভিটামিন D কি করোনা ভাইরাস থেকে কোন ভাবে রক্ষা করে? অথবা ভিটামিন D কি কোবিড-১৯ এর উপর কোন ভাবে প্রভাব বিস্তার করে?

এর উত্তর জানতে গিয়ে ইংল্যান্ডে কমিউনিটি হেলথ দেখা শোনা করার ডিপার্টমেন্ট Public Health England (PHE) গত মাসে কোভিড-১৯ এবং ভিটামিন D -এর সম্পর্ক নিয়ে এ পর্যন্ত হয়ে যাওয়া ১৮৭ টি লিটারেরি রেফারেন্সকে জড়ো করে তার মধ্য থেকে ৫টিকে পুনরায় বিচার বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা পত্র প্রকাশ করেন এবং একটি নির্দেশনা দেন।

বিশ্লেষণে ৪টি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়।

1. কোভিড ১৯ ট্রিটমেন্টে ভিটামিন D -এর ভূমিকা আছে কিনা
2. কোভিড ১৯ প্রতিরোধে ভিটামিন D কোন ভূমিকা রাখে কিনা।
3. ভিটামিন D এর অভাব থাকলে তা কোভিড ১৯ এ সহজে আক্রান্ত হওয়াতে কোন ভূমিকা রাখে কিনা।
4. এমন কোন গ্ৰুপের কিছু মানুষকে বের করা যায় কিনা যারা ভিটামিন D গ্রহণ করলে কোভিড ১৯ আক্রান্ত না হওয়ার সুবিধাটি পেতে পারেন।

প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর ছিল – না। কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা কিংবা প্রতিরোধে ভিটামিন D -এর কোন ভূমিকা নেই।

তৃতীয় প্রশ্নটিতে কয়েকটি গ্ৰুপে ভাগ হয়ে গেছে। ভিটামিন D-এর অভাব সরাসরি কোভিড-১৯ এ কোন ভূমিকা না রাখলেও দেখা গেছে যে- বয়স, এথনিসিটি, পূর্ব থেকে কিছু রোগ, আবহাওয়া, এমন কিছু ফ্যাক্টরের পাশাপাশি অবস্থান এবং ভিটামিন D -এর অভাব কোভিড আক্রান্ত হওয়াতে ভূমিকা রাখে। যেমন : কালো এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মানে উপমহাদেশের মানুষদের ত্বকে মেলানিনের ঘনত্ব বেশি থাকায় সূর্যের UVB রশ্মি পর্যাপ্ত ভিটামিন D তৈরিতে বাধা দেয়, যা শরীরকে ভিটামিনের ঘাটতির মধ্যে রাখে।

চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে দেখা গেছে – ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসের দীর্ঘদিনের সমস্যা, পার্কিনসন্স ডিজিজ, স্থূলতা (obesity), এমন গ্ৰুপের লোকেরা ভিটামিন D খেলে ভাইরাসে সহজে আক্রান্ত হওয়া কিংবা আক্রান্ত হলে সমস্যা প্রকটের দিকে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

লক-ডাউন পরিস্থিতি, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় অনেক ভাবেই এখন আমাদের বাহিরে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত সূর্যের আলোর মুখোমুখি হয়ে ভিটামিন D -এর একটি অন্যতম উৎসতে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। সাথে খাদ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ এবং সীমিত পছন্দের কারণে খাদ্য উৎসতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সবারই শরীরে কম-বেশি ভিটামিন D -এর ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

পরামর্শ হল :

সুস্থ যে কেউ প্যান্ডেমিক সময়ে প্রতিদিন ১০ মাইক্রোগ্রাম বা ৪০০ IU এবং যারা বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় পূর্ব থেকে আক্রান্ত, তারা প্রতিদিন ২০ মাইক্রোগ্রাম বা ৮০০ IU পর্যন্ত ভিটামিন D জাতীয় সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত খেলে ভালো হয়। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই দৈনিক ১০০ মাইক্রো গ্রামের বেশি খাওয়া যাবে না।

গবেষণার উপসংহারে মূল কথা এবং দিকনির্দেশনায় বলা হয় :

“There is no evidence to support taking vitamin D supplements to specifically prevent or treat COVID-19. However, all people should continue to follow UK Government advice on daily vitamin D supplementation to maintain bone and muscle health during the COVID-19 pandemic.”

অর্থাৎ “COVID-19 বিশেষত প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য ভিটামিন ডি পরিপূরক গ্রহণের পক্ষে সমর্থন করার কোনও প্রমাণ নেই। তবে, COVID-19 মহামারী চলাকালীন হাড় এবং পেশীগুলির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে প্রতিদিনের ভিটামিন ডি পরিপূরক সম্পর্কে ইউকে সরকারের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।”

সূত্র :

1. NFS Journal : https://doi.org/10.1016/j.nfs.2020.06.001
2. Journal of Investigative Medicine : https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC3166406/
3. National Institute for Health and Care Excellence : vitamin D for COVID-19 : https://www.nice.org.uk/…/covid19-rapid-evidence-summary-vi…
4. NHS UK

© অপূর্ব চৌধুরী। চিকিৎসক এবং লেখক। জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড। গ্রন্থ ৭। উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত।