ডাক্তারি পরামর্শলীড

ডিগ্রি দেখে ডাক্তার চেনার উপায়

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদারঃ একটা কথা আছে, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। শরীরটা আপনার। এর যত্ন আপনাকেই নিতে হবে। নানা কারনে অসুখ হবে আপনার শরীরে। ডাক্তারই ভালো জানেন কিভাবে আপনার অসুখ ভালো করা যায়। পৃথীবির সব মানুষের জ্ঞান সমান না। ডাক্তাররাও মানুষ। তাই সব ডাক্তারের জ্ঞান সমান না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে ডাক্তাররা চিকিৎসা বিদ্যা অর্জন করে পরীক্ষায় পাসের মাধ্যমে ডাক্তারি করার সার্টিফিকেট পান। সার্টিফিকেটের ধরন দেখে ডাক্তারের জ্ঞান ও দক্ষতার পরিমাণ বুঝা যায়। বাংলাদেশের যারা নূনতম ব্যাচেলর অব মেডিসিন এন্ড ব্যাচেলর অব সার্জারি (এমবিবিএস) সার্টিফিকেট পেয়েছেন তাদেরকে সরকারি কর্তৃপক্ষ বিএমডিসি ডাক্তার আখ্যায়িত করে চিকিৎসা করার অনুমতি দিয়েছেন। এক কথায় বলা যায় রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তার। রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তাররা সাধারণ সব রোগের চিকিৎসা করার অনুমতি পেয়েছেন। পরীক্ষার সময় সবাই সমান নাম্বর পাননি। কেউ পেয়েছেন ৮৫% নাম্বার, কেউ পেয়েছেন ৭৫% নাম্বার, কেউ পেয়েছেন ৬০% নাম্বার। এর নিচে পেলে পাশ হয় না। নাম্বার পাওয়া দেখেই বুঝা যাচ্ছে পাস করা হলেও সব ডাক্তারের জ্ঞান ও দক্ষতা সমান না। তবে পাস করা সব ডাক্তারের উপর সাধারণ রোগের চিকিৎসার ভরসা করা যায়।

এই এমবিবিএস পাস করা ডাক্তারদের মধ্যে অনেকেই আরও পড়েন এবং প্রশিক্ষণ নেন বিভিন্ন বিষয়ের উপর এবং সার্টিফিকেট অর্জন করেন যাকে বলা হয় পোস্ট গ্রাজুয়েট সার্টিফিকেট।

অল্পকিছু দিন, ধরুন, ছয় মাস কোন একটা বিশেষ বিষয়ের উপর অনুমোদিত হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সার্টিফিকেট গ্রহন করলে ডাক্তার সাব তার প্রেস্ক্রিপশন প্যাডে লেখেন বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অথবা পিজিটি। যার পূর্ণ শব্দগুলো হলো পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেইনিং। কোন কোন সাবজেক্টের বেলায় সার্টিফিকেট লেখা হয়। যেমন, সার্টিফিকেট ইন আল্ট্রাসাউন্ড (সি-আল্ট্রা), সার্টিফিকেট কোর্স ইন ডায়াবেটিস (সিসিড) ইত্যাদি।

বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স এন্ড সার্জন, সংক্ষেপে বিসিপিএস নামে একটা চিকিৎসা বিদ্যার কলেজ আছে। এই কলেজ থেকে ডাক্তারদের দুই রকম পোস্ট গ্রাজুয়েট সার্টিফিকেট দেয়া হয় – একটা হলো মেম্বারশিপ, আরেকটা হলো ফেলোশিপ। মেম্বারশিপ হলো এমসিপিএস যার পূর্ণ শব্দগুলো হলো মেম্বার অব কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স এন্ড সার্জন। এই সার্টিফিকেট পেতে ভর্তি হতে হয়না। নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর এক বছরের প্রশিক্ষণ থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাস করে এই সার্টিফিকেট নিতে হয়। ফেলো অব কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স এন্ড সার্জন এর সংক্ষিপ্ত শব্দ হলো এফসিপিএস। এই সার্টিফিকেট এর জন্য সরাসরি পরীক্ষা দিয়ে প্রথম পর্ব পাস করে ভর্তি হয়ে ৩ বছরকাল প্রশিক্ষণ নিতে হয়। ডিজার্টেশন নামে গবেষণা পুস্তক বের করতে হয়। পরীক্ষা দিয়ে পাস করে এফসিপিএস পাস করতে হয়। বাংলাদেশের প্রাইভেট প্রাক্টিশনারদেরএমন একটা প্রতিষ্ঠান এফসিজিপি নামে একটা সার্টিফিকেট দেন। আমি কয়েকজন রোগীকে দেখেছি এফসিপিএস পাস ডাক্তার মনে করে এফসিজিপি পাস ডাক্তার দেখিয়েছেন। আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে এমন একটা কলেজ আছে যার নাম আমেরিকান কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স। তারাও মেম্বারশিপ ও ফেলোশিপ সার্টিফিকেট দেন। এদেশে বসেই এই সার্টিফিকেট পাওয়া যেতো । পোস্ট গ্রাজুয়েট সার্টিফিকেটধারী ডাক্তাররা গবেষণার প্রকাশিত আর্টিকেল, প্রেজেন্টেশন, একাডেমিক পারফর্মেন্স রেকর্ড, দুইজন প্রাক্তন সার্টিফিকেটধারীর সুপারিশপত্র পাঠিয়ে দিলে তারা বিচার বিশ্লেষণে করে মেম্বার অব আমেরিকান কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স এন্ড সার্জন (এমএসিপি) এবং ফেলো অব আমেরিকান কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স এন্ড (এফএসিপি) সার্টিফিকেট নেয়া হতো । আমি এভাবে এমএসিপি সার্টিফিকেট নিয়েছি ২০০৬ সনে । ব্রিটেন থেকেও অনুরূপভাবে সার্টিফিকেট নেয়া যেতো ফেলো অব রয়েল কলেজ অব ফিজিসিয়ান্স (এফআরসিপি), ফেলো অব রয়েল কলেজ অব সার্জন (এফআরসিএস) ইত্যাদি সার্টিফিকেট এদেশে বসেই। আমি এফআরসিপ্যাথ সার্টিফিকেট নেয়ার জন্য এপ্লাই করতে চেয়েছিলাম ২০০৭ সনে। তারা চেয়েছিল কমপক্ষে ফার্স্ট অথর হিসাবে ৩০ টা পাবলিকেশনস। তখন আমার ছিল ২৫ টা খুব সম্ভব। ৩০ টা থাকলে পরীক্ষা ছাড়াই পেতাম। পরে আর নেয়া হয়নি। অনেকেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এইসব সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছেন।

প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে দুই বছরের প্রশিক্ষণ নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে অর্জন করতে হয় পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট। ডিপ্লোমা থেকে ডি নিয়ে তারপর সেই সাব্জেক্টের নাম লিখে প্রকাশ করা হয় প্রেস্ক্রিপশন প্যাডে। যেমন, ডিপ্লোমা অব অপথালমোলজি (ডিও)।

মাস্টার অব ফিলোসোফি (এম ফিল) কোর্সটাও দুই বছরের। এডমিশন টেষ্ট দিয়ে ভর্তি হয়ে থিওরিটিকেল জ্ঞান অর্জন করে, প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং মৌলিক বিষয়ে গবেষণা করে থিসিস বই লিখে পাস করে এই সার্টিফিকেট নেয়া যায় ইউনিভার্সিটি থেকে। এটা একটা পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রি। যেমন, এম ফিল মেডিকেল সাইন্স (প্যাথলজি)।
ডক্টর অব মেডিসিন (এম ডি) মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি। বেসিক সাইন্সেরগুলো ৪ বছরের এবং ক্লিনিক্যাল বিষয়েরগুলো ৫ বছরের কোর্স। ভর্তি হয়ে, ক্লাস করে এবং থিসিস লিখে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে এই সার্টিফিকেট পাওয়া যায়।

মাস্টার্স অফ সার্জারি (এম এস) হলো সার্জারি বিষয়ের উপর ইউনিভার্সিটির ৫ বছরের কোর্স। এটার জন্যও ভর্তি হতে হয়, ক্লাস করতে হয় এবং থিসিস বই লিখতে হয়। এম এস নামে নন-মেডিকেল ডিগ্রিও আছে। সেটার পূর্ণ শব্দ দুটো হলো মাস্টার অব সাইন্স। পরিস্কার বুঝার জন্য সার্জারির ব্রানঞ্চের নাম দেখতে পাবেন ব্রাকেটের ভেতর। যেমন, এম এস ( শিশু সার্জারি)।

সবশেষে হলো পিএইচডি। লম্বা ডিগ্রি। সুক্ষ্ম একটা বিষয়ের উপর ব্যাপক গবেষণামূলক কাজ করে থিসিস লিখে ৫ বছরে অর্জন করতে হয় এই সর্বোচ্চ ডিগ্রি ইউনিভার্সিটি থেকে। এর পূর্ণ শব্দগুলো হলো ডক্টর অব ফিলোসোফি।

সার্টিফিকেট যেখান থেকে যেটাই নেয়া হোক না কেনো বিএমডিসি সবগুলো প্যাড ও সাইনবোর্ডে লেখার অনুমতি দেন না। বিএমডিসি অনমোদিত সার্টিফিকেট বা ডিগ্রি লেখা উচিৎ বাংলাদেশে প্র‍্যাক্টিসরত ডাক্তারদের। মাঝে মাঝে ব্যাবসার খাতিরে অনেককে এই আইন ভঙ্গ করতে দেখা যায়। কোন কোন ডিগ্রি অনুমোদিত তা এখানে আমার লেখা ঠিক হবে না। আপনারা বিএমডিসির ওয়েবসাইট থেকে দেখে নিতে পারেন।

এতক্ষণ যেসব সার্টিফিকেট, ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি নিয়ে যে কথাগুলো জানলাম এগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারলে আপনার ডাক্তার কেমন জানেন বা বোঝেন তা অনুমান করতে পারবেন। নিজের জন্য সঠিক সার্টিফিকেটধারী ডাক্তার পছন্দ করতে পারবেন বলে আশা করি।
৩/৯/২০২০ খ্রি.
ময়মনসিংহ

তথ্যগত কোন ভুল পেয়ে থাকলে আমাকে ইনবক্স করুন অনুগ্রহ করে।

ডাঃ সাদেকুল ইসলাম তালুকদার
এমবিবিএস (মচিম), এম ফিল প্যাথলজি (আইপিজিএমআর)
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (পিআরএল)
প্যাথলজি বিভাগ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ