গল্প আড্ডা

গল্প : ফরিদ হোসেনের ফেসবুক স্ট্যাটাস

অন্য সবার মত আমারও একটা ফেসবুক আছে।
কিন্তু আমি কাউকে লাইক দেইনা।
মনে মনে কমেন্ট করি কিন্তু কাউকে কিছু লিখিনা।
চুপ করে সব দেখে যাই।
না, আমি মোটেই হিংসুক নই। আমি আসলে তোমাদের এইসব কোন কিছুই কেয়ার করি না।
এই আর কি।
তোমাদের এত সব আজে-বাজে লেখা আর তোমার ঐ এডিট করা কালারফুল ছবিতে আমার মনে ভালোবাসা জাগে না।
আমি কি করবো বলো?
ফেসবুকে লাইক, ওয়াও, লাভ, সেড এইসব চিহ্ন আর ইমোজি আছে। কিন্তু “আই ডোন্ট কেয়ার” নামে কিছু নেই।
সুতরাং এখানে আমারতো কোন জায়গা নেই। বলার মতন কোন কথা নেই।

তুমি তিন রকমের মাছ, দুই রকমের ভর্তা আর ডাল সবজি দিয়ে খাবার টেবিল সাজিয়ে ছবি দিয়েছো। কিন্তু আমি যে এই সপ্তায় কোন মাছ কিনতে পারিনি, সেই আমি “আই ডোন্ট কেয়ার” ছাড়া আর কি কমেন্ট দিবো, তুমিই বলো?
একটা ছোট অফিসে কাজ করতাম, গত তিন মাস বন্ধ। মালিক কোন বেতন দেয়নি।
বাসা ভাড়া দিতে পারিনি। ঘর থেকে বের হতেই লজ্জা লাগছে।

আমার মেয়েটা একটু মুরগির মাংস হলে ভাত খায়, রোজ রোজ সবজি দিয়ে জোর করে আর কতদিন খাওয়াবো বলো?
বউটা আমার কেমন নীরব হয়ে গিয়েছে। সারাক্ষণ কেমন চুপ করে থাকে।

জানালার পাশে বসে একাকী নিঃসঙ্গ কি সব ভাবে বলতে পারছিনা। আমি কিছু জিজ্ঞেস করলে, কোন উত্তর দেয়না।
কথা বলে না।

তোমরা যখন করোনা নিয়ে হাসাহাসি করো, আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করো, তখন আমি মনে মনে কথা সাজাই, কি বলে কার কাছে টাকা হাওলাত চাইবো।

তোমরা কি জানো আমি অনেক শুকিয়ে গিয়েছি। মাত্র তিন মাসেই আমার ওজন দশ কিলোগ্রাম কমে গিয়েছে।
এখন আমি যদি তোমাদের ফেসবুকে একটা ছবি দেই, সেখানেও তুমি লাইক দিবে।
কিন্তু তোমার লাইক কি আমার ঘরে চাল-ডাল নিয়ে আসবে?
আচ্ছা, তোমরা কি এখনো টিভিতে সিরিয়াল দেখো?
কি দেখো?
তোমাদের কি এখনো প্রিয় নায়ক-নায়িকা আছে?

খুব জানতে ইচ্ছে করছে, তোমরা কি এখনো তোমাদের নেতাদের পায়ের কাছে কুকুরের মত বসে থাকো?
এখনো কি তোমরা এইসব চোরদের সাথে সগর্বে ছবি তুলে ফেসবুকে দাও?

তুমি কি জানো, কাল রাতেও আমি একবার ভেবেছিলাম একটা রিকশা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়বো।
আমি জানি, ঠিক এই কথাটা লিখে এখন যদি আমি একটা স্টেটাস দেই,
তুমি একটা হা হা রিঅ্যাকশন দিয়ে “নেমে যান ভাই” বলে কমেন্ট দিবে।
আমি যদি বলি,
“রাতে আমার ঘুম হয়না”
আমি জানি, তুমি কমেন্ট দিবে।
“ভাবীকে মাথা বানায়া দিতে বলেন” I

অথচ তুমি জানোনা, আমার দুই সন্তানের মা, অসহায় সেই নারীকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আচ্ছা তোমাদের এত সুন্দর ফেসবুকে আমি এইসব কেন লিখছি?

আমার তো এইসব লেখার কথা নয়।
কারণ,
“আই ডোন্ট কেয়ার”
না, আমাকে নিয়ে মন খারাপ করোনা।
বরং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে আমার সাথে তুলনা করে ভালো থেকো।
ফেসবুক নিয়ে সুখে থাকো।
একটিভ থাকো।

আমি চুপ করে আছি তার মানে এই নয়, আমি হারিয়ে গিয়েছি।
আমি কথা বলে কোন শক্তি অপচয় করছিনা।

কারণ এই মুহূর্তে, আল্লাহ ছাড়া আমার শক্তিটুকুই একমাত্র সম্বল।