গল্প আড্ডালীড

সেই মেয়েটির জন্মদিনে…

ডা. আফতাব হোসেন :

সেই মেয়েটির জন্মদিনে…
বরিশালের ভাষায় একটা প্রবাদ আছে, ‘পাগলা তুই হাক্কা লারাইস না’। প্রবাদটা আঞ্চলিক ভাষায় হলেও অর্থটা কারও না বোঝার কথা না। আমিই বেকুব, বুঝলেও সব সময় মনে থাকে না। এমনিতেই আমার ঘুম পাতলা, তার উপর বাত্তি জ্বালাইলে ঘুম আসে না। রাত বারোটা পেরিয়ে গেছে। অথচ বাত্তি নেভে না। নিদ্রা দেবীও কাছে ঘেঁষে না। ঘেঁষবে কেমনে? পাশে দেবী চৌধুরানী তখনও সজাগ। উপর হয়ে শুয়ে নিবিষ্ট মনে একটা কিছু লিখছেন। না না, গল্প কবিতা লেখার ধাত তেনার নাই। একমাত্র বাজারের ফর্দ ছাড়া এত মন দিয়া তিনি আর কিছু লেখেনও না। কিন্তু আজ সকালেই তো আগামী পনেরো দিনের বাজারঘাট করা সারা। তাইলে? শেষ প্রেমপত্র লিখেছিল, তাও ছত্রিশ বছর আগে। কাঁচাপাকা দাড়ি-চুলের এই বুইড়ারে থুইয়া নতুন কইরা কারও প্রেমে পড়ে নাই তো? এখনও যা চেহারা ছুরত তার! ভয়ে ভয়ে জিগাইলাম,

– বউ, কী লেখো?

– লিস্টি।

– আইজই তো বাজার করলা। আবার কীসের লিস্টি?

– বাহ, হলিডেতে যাব, কী কী নিতে হবে, লিস্টি করব না? যদি কিছু ভুলে যাই?

লিস্টির নাম শুনেই আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা কাঁকড়া একে-বেঁকে নীচে নেমে যায়! নেপাল হলিডের বিভীষিকা আমার আজও মনে আছে! সেবার তার লিস্টি করা বায়ান্ন আইটেমের লাগেজ টানতে টানতে আমার শিরদাঁড়া বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস, লম্বা নই। নইলে কোমরটা আমার আমার মট্টাশ করে ভেঙ্গে যেত! তবে ক্ষয়ক্ষতি যে একেবারে হয় নাই, সেটাও হলফ বলা যায় না। লাগেজের ভারে আমার হাইট নির্ঘাত কয়েক মাইক্রোমিটার কমে গেছে!

হঠাৎ ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে আমার। এবার তো যাচ্ছি দেশের ভিতরেই। তাও আবার নিজের গাড়ি নিয়ে। সাথে ড্রাইভার। যত খুশি লিস্টি করুক। আমাকে লাগেজ টানতেও হবে না, এক্সট্রা ওয়েট চার্জও দিতে হবে না। ঝাঁসির রানীকে খুশি করার জন্য বললাম,

– এবার ইচ্ছে মতো লিস্টি করতে পারো। কিছু বলব না।

বকের মতো লম্বা ঘাড়টা বাঁকিয়ে একটু অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, মনে থাকে যেন।
গত সাত মাস ধরে করোনা বিবির ভয় দেখিয়ে কারিনা বিবিরে ঘরেই বন্দি করে রেখেছিলাম। যদিও ইতোমধ্যে চামে চামে আমি দুই একটা ট্যুর দিয়ে ফেলেছি। তারে সাথে নিই নাই। বউরা একটু বোকাসোকা হলে স্বামীদের খুব সুবিধা। এটা সেটা বুঝিয়ে পার পাওয়া যায়। বয়সের সাথে সাথে মনে আমার বৈরাগ্য বাসা বেঁধেছে। ঘরের চেয়ে বাহির আমায় বেশি টানে। পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। আমার পাগল পাগল লাগে। কিন্তু প্রতিবার বোকা মেয়েটিকে ফাঁকি দিয়ে একা একা ঘুরে বেড়াতে বিবেক সায় দেয় না।

মনে পড়ে, চল্লিশ বছর আগে বনলতা ঝড়ে আমি যখন লণ্ডভণ্ড, ছেঁড়া পালে, ভাঙ্গা হালে আমার জীবন নৌকা যখন হতাশার সাগরে ডুবে যাচ্ছিল, তখন এক দারুচিনি দ্বীপের রাজকন্যার মতো এই মেয়েটি বাড়িয়ে দিয়েছিল তার কিশোরী কোমল হাত। যে হাত আমাকে আবার উঠে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল, আবার পথ চলতে শিখিয়েছিল, আবার ভালোবাসতে শিখিয়েছিল। ভাবলাম সেই মেয়েটির জন্মদিনে সাগর দেখিয়ে আনি, দারুচিনি দ্বীপ ঘুরিয়ে আনি।

বছর পাঁচেক আগেও একবার তাকে সাগর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। জীবনে সেই প্রথম তার সাগর দেখতে যাওয়া। আর পৃথিবীতে সম্ভবত সে’ই প্রথম মেয়ে যে সাগরের কাছে যেয়েও সৈকতে নামেনি, পায়ে বালি লাগবে এই ভয়ে। সাগরের কাছে যেয়েও সেবার তার সাগরের জলে পা ভেজানো হয়নি, সাগরের পানি ছুঁয়ে দেখা হয়নি। তাই এবার একেবারে সাগরের কুল ঘেঁষে হোটেল ভাড়া করেছি, দশ তলায় রুম নিয়েছি, যাতে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুচোখ ভরে সাগর দেখতে পারে, সাগরের ভেজা বাতাসে সমস্ত শরীর ভেজাতে পারে।

দু’দিন ধরে চলে তার লিস্টি ধরে গোছগাছ করা। হায়, কত বিচিত্র এই মেয়েদের স্বভাব। সবই পাওয়া যায়, তবু সব কিছু নিয়ে যেতে চায়। আবার ভাবি, সব নিয়ে যেতে পারলেই যদি খুশি হয়, হোক না। তবে আমার খুশি উবে যায়, যখন দেখি, যাবার দিন সকালেও তার গোছগাছ চলছে। মেজাজটা আর ঠিক থাকে না। বলি,

– এই দুদিন বসে কী করলা যে এখনও গুছাচ্ছ?

– এই তো, একটু ফাইনাল চেক করছি!

কাঁচুমাচু হয়ে বলে বউ। যেভাবে পরীক্ষার শেষ ঘণ্টা পরার পরও আর একটু রিভিশন দিতে সময় চায় পরীক্ষার্থী। মায়া লাগে আমার। হোক না একটু দেরি। আমার তো আর ট্রেন মিস হবার ভয় নাই। হেসে জিজ্ঞেস করি,

– তা এবার লিস্টি কত লম্বা হলো?

– বেশি না। আটষট্টি।

– বলো কী? আটষট্টি, বেশি না?

– তুমিই তো বললা, যত খুশি নাও, কিছু বলবা না।

শুনে আমি হাসব না কাঁদব, বুঝতে পারি না। হলিডে করতে যাচ্ছি, না নাতী পোতা নিয়ে সংসার পাততে যাচ্ছি, তাও বুঝতে পারছি না। এখন আর কিচ্ছু করার নেই, আমিই তো পাগলাকে হাক্কা (সাকো) নাড়ানোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছি।

ছোট বেলায় দেখেছি, বিড়ালের বাচ্চার জন্মের পরপরই চোখ খোলে না। কয়েকদিন পর খোলে। বিয়ের পর থেকে দেখছি, সকাল বেলা তার মুখ খোলে না। মানে কিছু খেতে পারে না। কয়েক ঘণ্টা পর খোলে। তাই যাত্রা পথে সে তার নাস্তা সঙ্গে নিয়ে নেয়। মুখ খুললে ধীরেসুস্থে আয়েশ করে খায়। ঘণ্টা দুই গাড়ি চলার পর এবারও তার যথারীতি খিধে পেলো। টিফিন বক্স খুলেই আঁতকে উঠল,

– আমার কাঁটা চামচ কই?

– তা আমি কী করে বলব? লিস্টি ধরে জিনিষপত্র তো তুমিই গুছালে।

– তাই বলে তুমি একটু খেয়াল করবা না? সব দোষ কাজের মেয়েটার। একটা দিকে নজর দেই নাই, অমনি সব ভুলে বসে আছে।

– ওর কী দোষ? ও তো দেখলাম, সকাল থেকেই তোমার পিছে পিছে ঘুরতেছে?

– এখন আমি খাবো কেমন করে?

– কেন? আল্লাহ তালা কতো সুন্দর দুটো হাত দিছেন, তাই দিয়ে খাও।

– বাহ, হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে না? সাবান কোথায় রাখছি, তা আবার লিস্টি দেখে বের করতে হবে।

– একদিন সাবান দিয়ে না ধুলে কিছু হবে না। কাপড়ে হাত মুছে খাও। আমি কতবার পাছায় হাত মুছে খাবার খেয়েছি।

– ওয়াক! তোমার মতো গিধের আমি দুনিয়াতে দুইটা দেখি নাই।

আসলেও তাই। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টা আমার ভেতরে নাই। মেডিকেলে পড়ার সময় তো একবার সারা সকাল লাশ কাটাকুটি করলাম। এবং যথারীতি হাত ধুতে ভুলে গেলাম। টিফিন পিরিয়ডে সিঙ্গারা খেতে যেয়ে দেখি, সিঙ্গারায় উৎকট গন্ধ! বয়কে ডেকে খেঁকিয়ে উঠলাম,

– এই ব্যাটা, আমারে বাসী পচা সিঙ্গারা খাইতে দিছোস?

– কন কী ছার? আপনের সিঙ্গারা দিয়া দেহি এহোনো ধোঁয়া বাইরাইতাছে। আপনের হাত হুইঙ্গা দেহেন।

হাত নাকের কাছে নিতেই দেখি, গন্ধ সিঙ্গারায় না, আমার হাতে। ফরমালিন দেয়া ডেড বডির গন্ধ কেমন, মেডিকেল স্টুডেন্ট ছাড়া কেউ জানে না।

এর চেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আছে। একবার খুব মজা করে পার্কে বসে ঝালমুড়ি খেলাম। এমনিতেই হাত ধোয়ার অভ্যাস নাই। তার উপর পার্কে পানি কোথায় পাই? ঝালমুড়ির ঠোঙ্গায় হাত মুছে রুমে ফিরে আসলাম। এবং আবারও যথারীতি হাত ধুতে ভুলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেয়ে টের পেলাম, কী ভয়ানক ভুল হয়ে গেছে! সে রাতে মুখে হাত চাপা দিয়ে যে পরিমাণ লাফালাফি করেছিলাম, সারা জীবনে আর কোনো ব্যায়াম না করলেও চলবে!

যাহোক, যে মেয়ে চামচ দিয়ে আমাকে খাবার বেড়ে দেয়ার আগেও ভালো করে সাবান দিয়ে নিজের হাত ধুয়ে নেয়, যে মেয়ে আমি খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত নিজে না খেয়ে পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে অভুক্ত রাখি আমি কোন প্রাণে? গাড়ি থামিয়ে তার হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করলাম।

মানুষ কেন মানুষকে ভালোবাসে আমি জানি না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ছাড়াও আমার অনেক কিছুই এই মেয়েটির পছন্দ না। যেমন আমি মোটা আবার খাটো, এলোমেলো আর অগোছালো, বেকার কিন্তু বে-হিসেবী, তার কথা কানে কম শুনি, আবার তার সাথেই চিৎকার করে কথা বলি, হাতপা ছড়িয়ে ঘুমাই আবার মাঝে মাঝে নাকও ডাকি, প্রচুর সিগারেট খাই, এখানে সেখানে ছাই ফেলাই, লিখতে গেলে হয়ত তার “আটষট্টি লিস্টি” ছাড়িয়ে যাবে। তবুও সে আমাকেই ভালোবাসে।

আজ সেই মেয়েটির জন্মদিন। তাকে নিয়ে পাড়ি দেবো সমুদ্র, পৌঁছে যাব দারুচিনি দ্বীপে। সেখানে প্রিয় লেখক, প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের সমুদ্র বিলাসে বসে খুঁজব ভালোবাসার মানে …