গল্প আড্ডালীড

দিন বদলের গল্প (সত্য কাহিনী)

– ডক্টর, একা একা বসে কী ভাবছেন? আসুন, চাই খাই।

চমকে তাকিয়ে দেখি দরজায় দাড়িয়ে হোসেন আলী। লম্বা ঢ্যাঙ্গা শরীর। থুতনিতে অল্প ক’টা দাড়ি। চাইলেই গোনা যায়। সাকুল্যে গোটা পঞ্চাশেক হবে হয়ত। বয়সও পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। অথচ বেশ মজবুত শরীর। মেদহীন। হোসেন ফার্মেসীর মালিক। নিজের নামের আগে ডাঃ লেখেন। যদিও মেডিকেল কোনো ডিগ্রী নেই তার। শুনেছি ফার্মাসিস্ট সার্টিফিকেটটাও কেনা। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে যে যা চায় করতে পারে। তাই হোসেন আলীও ডাক্তার না হয়ে বহাল তবিয়তে ডাক্তারি করেন। নিজের নামে ছাপানো প্যাডে খস খস করে ওষুধ লেখেন। ইনজেকশন লেখেন। নিজেই পুশ করেন। মাঝে মাঝে গ্লুকোজ স্যালাইনের মধ্যে রঙ্গিন ভিটামিন ইনজেকশন মিশিয়ে পুষ করে দোতলায় শুইয়ে দেন। ভিজিট নেন না। ওষুধ, ইনজেকশন, স্যালাইন বিক্রিতেই তার রমরমা ব্যবসা। আর ভিজিট দেয়া লাগে না বলে জুট মিল এলাকার গরীব রুগীরা তাকে দেখাতে লম্বা লাইন দেয়। সদ্য পাশ করা এমবিবিএস ডাক্তার আমি। রুগী-পত্র নেই বললেই চলে। হোসেন আলীর পাশের রুমেই বসি। বটতলার উকিলের মত নিজেকে ছাদনাতলার ডাক্তার মনে হয়। স্বাভাবিক দিনেই রুগীর পথ চেয়ে বসে থাকি। তার উপর আজ আবার ঘনঘোর বরষা।

পাশ করে বন্ধুরা যখন পিজিতে বসে পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের পড়াশুনায় মগ্ন, আমি তখন তল্পিতল্পা গুটিয়ে খুলনায় চলে আসি। আব্বা চলে যাবার আগে, মা ও তিন ভাই বোন রেখে গেছেন। সাথে আমার পছন্দ করা মেয়েকেও বউ করে ঘরে এনে দিয়ে গেছেন। ছয় ছয়টি মুখের অন্ন জোগানোর একমাত্র অবলম্বন আমি। তার উপরে ভাই বোনদের পড়াশুনা। সম্বল বগলে একখানা এমবিবিএস সার্টিফিকেট। আপাতত নিজের পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের স্বপ্নকে বুকের সিন্দুকে তালাবন্ধ করে রেখে, ফুলবাড়ি গেটে হোসেন ফার্মেসীতে বসে, হোসেন ডাক্তারের মত অনেক রুগী দেখার স্বপ্ন দেখি। ভাগ্যগুণে খুলনা বিআইটিতে মেডিকেল অফিসারের চাকরিটা পেয়েছিলাম। সেই সুবাদে স্ত্রী, মা, ভাই বোন সহ বিআইটির টিচার্স কোয়ার্টারে থাকি। আর সপ্তায় সাত দিনই হোসেন ফার্মেসীতে বসি। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি কিছুই আটকাতে পারে না। পাছে একটা রুগী ছুটে যায়। আজ সকাল থেকেই আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি। আষাঢ়ের মাঝামাঝি হবে। চেম্বারে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি দেখে আমার কিশোরী স্ত্রী বলে,

– এই বৃষ্টির মধ্যেও চেম্বারে যাবা?
– হুম।
– একদিন না গেলে কি হয়?

আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাই। ডাগর দুটি চোখে ছোট্ট একটু মিনতি। কতই বা বয়স ওর? উনিশ কী বিশ। অথচ আমাকে নয়, ছোট্ট এই মেয়েটির হাতেই আব্বা তার সংসার দেখে রাখার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। সেই থেকে ও ওর ছোট্ট কোমল দুই হাতে এই সংসার, আমার মা, ভাই বোন, সবাইকে আগলে রেখেছে পরম মমতায়। কী করে বোঝাই, এই মায়াবতী মেয়েটির এমন মায়ার ডাক এড়ানো কঠিন কত? কী করে বোঝাই, সংসারের চাকা সচল রাখতে চেম্বারে যাওয়া আমার জন্য জরুরী কত? কিছু না বলে কাক ভেজা হয়েই চেম্বারে যাই। আমার মতই আরও কিছু নিরুপায় দোকানী পসরা সাজিয়ে বসে আছে খদ্দেরের আশায়। কে আসবে এমন ঝড় বাদলের দিনে একান্ত অনন্যোপায় না হলে?

হোসেন আলীর দু একজন রুগী যাও এসেছে, আমার একটিও না। একলা চেম্বারে বসে বসে ভাবছিলাম, আজ না আসলেও পারতাম। নতুন বউয়ের কাতর চোখের করুণ মিনতি মনের পর্দায় ভাসে। বেশী কিছু তো চায়নি সে। চেয়েছিল বৃষ্টি ভেজা একটি বিকেল। দু’কাপ চা নিয়ে মুখোমুখি বসা। বাটি থেকে ঝালমুড়ি নিতে যেয়ে একটু ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেয়া। নতুন বউয়ের এইটুকু আবদার পূরণের ক্ষমতাও নেই আমার। অক্ষমতার সে গ্লানিতে আমি ক্ষয়ে ক্ষয়ে যেতে থাকি। এমন সময় হোসেন আলী ডাকে তার চেম্বারে চা খেতে। তখন কে জানত, ঐ ডাকই বদলে দেবে আমার জীবন।

ফুলবাড়ি গেটে সবচে বড় ফার্মেসীটি হোসেন আলীর। দোতলা। নীচতলায় একপাশে ফার্মেসী, পিছনে হোসেন আলীর চেম্বার। মাঝখানে লম্বা করিডোর। অন্যপাশে পিছনে আমার চেম্বার, সামনে রুগীদের বসার জায়গা। এখন বিরান, ফাঁকা। আমি দীর্ঘশ্বাসটা চেপে, উঠে হোসেন আলীর চেম্বারে যাই। দেশ ভাগের সময় ইন্ডিয়া থেকে মাইগ্রেট করে এ দেশে এসেছেন। শুদ্ধ কোলকাতার বাংলায় কথা বলেন। মজলিশি মেজাজের লোক। দুজনেরই চা আর সিগারেটের নেশা। তাই আড্ডাটা বেশ জমে। হোসেন আলী প্রতিদিন ইত্তেফাক রাখেন। রাতে বাসায় নিয়ে যান। সে পেপার আর ফেরত আনেন না। চা খেতে খেতে আমি ইত্তেফাকে চোখ বুলাই। দেশের খবর নিয়ে তেমন মাথা ব্যথা নেই। ক্ষমতায় কে এলো, কে গেল, আমার মত ছাদনাতলার ডাক্তারের তাতে কী আসে যায়? ক্ষমতার পট বদলায়, সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায় না। খবরের কাগজে চাকরীর বিজ্ঞাপন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া আমার এক নেশা। একটা বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে যায়।

বোয়েসেলস এর বিজ্ঞাপন। ইরানে ডাক্তার নিয়োগ। ১৯৯০ এর জুন মাস। বছর দুই হয় ইরান ইরাক যুদ্ধ শেষ হয়েছে। যুদ্ধ বিদ্ধস্থ সে দেশে তখনও ডাক্তারের চাহিদা অনেক। সংসারের যে হাল, এমবিবিএস ডিগ্রী নিয়ে হয়ত পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থকতে পারব, ভাগ্য বদলাতে হলে বিদেশ যাওয়া ছাড়া গতি নেই। ভাগ্যিস আজ এসেছিলাম। নইলে হোসেন আলী পেপার বাসায় নিয়ে যেত। আমার আর সে বিজ্ঞাপন দেখা হত না। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক বিহীন সেই সব দিনে, মফস্বল শহরের শহরতলী, ফুলবাড়ি গেটে বসে এ খবর জানার আমার আর কোনো উপায়ও ছিল না।

হোসেন আলীকে বলে সেদিন পেপারের ঐ পাতাটা বাসায় নিয়ে আসি। চুপিচুপি দরখাস্ত লিখে পাঠিয়ে দেই। কাউকে কিছু বলি না। যদি ডাক না আসে? কী লাভ কিছু ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের মনে স্বপ্নের জাল বুনে? আমি একা একাই স্বপ্নের বাসর সাজাই। ইরান যাব। অনেক টাকা কামাই করব। সেই টাকায় যখন সংসারের অভাব মিটবে, আমি তখন বুকের ডালা খুলে স্বপ্নের পায়রাটিকে বের করব। যে বিলেত যেতে চায়, আব্বার স্বপ্নের বিলেত ফেরত ডাক্তার হতে চায়। দিন গড়িয়ে চলে ঢিমে তালে। আমার দরখাস্তের জবাব আর আসে না।

তিন সপ্তার মাথায় আমাকে চমকে দিয়ে একটি সরকারি হলুদ খাম আসে। হোসেন ফার্মেসীর ঠিকানায়। ইচ্ছে করেই বাসার ঠিকানা দিইনি। আমার বুকের ভেতর স্বপ্নের পায়রাটা ডানা ঝাপটে ওঠে। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলি। দেখি শর্ট লিস্টেড হয়েছি। শুধু একটা লিখিত পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষা নিয়ে ভাবি না। ও ঠিক উতরে যাবো। হোসেন আলী শুধোলো, কিসের চিঠি ডাক্তার সাহেব? তাকে সব খুলে বললাম। আমি যদি ইরান যাই, তাকে তো আর একজন ডাক্তার বসাতে হবে। তাই তাকে বলা। শুনে বাহ্যত বেশ খুশি হলেন। বলল, বসুন, আপনাকে একটু মিষ্টি মুখ করাই। বলেই দ্রুত বাইরে চলে গেলেন।

আমি কিছুটা তাজ্জব বনে গেলাম। পিঁপড়ের পেট টিপে পয়সা বের করা হোসেন আলী আমার ইরান যাবার খবরে এতটাই খুশি যে মিষ্টি আনতে ছুটে গেলেন! ঠিক মেলাতে পারছিলাম না। মনে মনে রসগোল্লা না হোক, নিদেন পক্ষে হালি-খানেক চমচম কিংবা কালোজাম আজ নিশ্চিত আমার উদরে যাবে। ভাবতেই মুখে পানির আধিক্য টের পেলাম।

আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে যতটা দ্রুত গেলেন, ততটা দ্রুতই ফিরে এলেন হোসেন আলী। তবে খালি হাতে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, ফুলবাড়ি গেটে কমপক্ষে ডজন-খানেক মিষ্টি ময়রার দোকান। তবে কি সে আমৃতি জাতীয় কোন বিরল মিষ্টি খুঁজে পায়নি? শুনেছি এই মিষ্টিটা ইন্ডিয়ায় বেশ জনপ্রিয়। আমার খাওয়া হয়নি কখনও। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হোসেন আলী পকেট থেকে একখণ্ড ভাজকরা কাগজ বের করে টেবিলে রেখে বলে, নিন, মিষ্টি মুখ করুন।

বলে কাগজের ভাজ খোলেন। আমার জন্য পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য অপেক্ষা করছিল সেখানে। দেখি, আধা চা-চামচের মত চিনি পড়ে আছে কাগজের ভাজে। রাজ্য জয় করার মুডে হোসেন আলী বললেন, পাশের চায়ের দোকান থেকে নিয়ে এলুম। ক’টা দানা মুখে দিন। শুভ কাজের শুরু মিষ্টি মুখে কোরতে হয়।

আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলাম না। এতদিন শুনেছি, “আদ্দেকটা ডিমের পুরোটাই খেতে হবে কিন্তু”! তাই বলে ক’দানা চিনি মুখে দিয়ে মিষ্টিমুখ? বাপের জন্মে শুনিনি। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছুক্ষণ তব্ধ মেরে বসে থাকি। “কই শুরু করুন”, হোসেন আলীর দরাজ কণ্ঠে তাড়া দেয়। ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলে এক চিমটি চিনি জিভের উপর রাখি। আর তখনই মনে হয়, আসলেই তো মুখটা মিষ্টি হয়ে গেলো! হোক না সে আমৃতি রসগোল্লা না হয়ে কটা চিনির দানা। মুখ মিষ্টি হওয়া নিয়ে কথা। লোকটা কঞ্জুস হলেও তার আন্তরিকতায় তো কোনো অভাব নেই। হোসেন আলীর প্রতি মনটা আমার ভালোলাগায় ভরে যায়।

বাধ সাধল অন্য খানে। জুলাই অগাস্ট বিআইটির ভর্তি সিজন। শ’তিনেক ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হয় বিভিন্ন বিভাগে। বিআইটির একমাত্র মেডিকেল অফিসার হিসেবে আমাকে তাদের মেডিকেল চেকআপ করতে হয়। বিনিময়ে প্রতিজন আমাকে পঁচিশ টাকা করে দেয়। তিনদিনে সাড়ে সাত হাজার টাকা। আমার জন্য অনেক টাকা। আমার পরিষ্কার মনে আছে, মেডিকেল চেকআপের দিন পড়েছিল ২৯, ৩০, ৩১ জুলাই। পড়বি তো পড়, আমার ইরান যাবার লিখিত পরীক্ষার ডেটও পড়ল ত০ জুলাই। ঢাকায়, হোটেল শেরাটনে। তার মানে ইরানের পরীক্ষা দিতে গেলে ভর্তিচ্ছুদের মেডিকেল চেকআপ করা হবে না। আমার অসুবিধার কথা ভেবে ইরান তো আর পরীক্ষা পেছাবে না।

আমি অনন্যোপায় হয়ে বিআইটির প্রিন্সিপ্যাল হান্নান স্যারের কাছে গেলাম। আমার দেখা অন্যতম একজন ভালো মানুষ। মনে পড়ে, চাকরী দেয়ার সময় বলেছিলেন, তুমি তো বেশীদিন থাকবা না। বলেছিলাম, খুলনার মেয়ে বিয়ে করেছি, শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবো স্যার? মিষ্টি হেসে স্যার বলেছিলেন, আচ্ছা দেখা যাবে। তবে হ্যাঁ। স্যার আমাকে জামাইয়ের মতই আদর করতেন। প্রচুর সুযোগ সুবিধা দিতেন। অথচ দু’বছরও পেরোয়নি। এর মধ্যেই বিদেশে পাড়ি দেয়ার তালে আছি। বেশ লজ্জাই লাগছিল। তবু স্যারকে সব খুলে বললাম। যদি কোনমতে মেডিকেল চেকআপের তারিখটা পেছানো যায়। স্যার বলল,

– তারিখ তো পেছানো যাবে না। চিঠি চলে গেছে। তবে তোমার এই সুযোগটাও হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। তুমি বরং দেখো, অন্য কোনো ডাক্তার দিয়ে প্রক্সি করাতে পারো কিনা?

স্যারের কথায় যেন আলোর দিশা পেলাম। ফুলবাড়ি গেটে তখন আরেকজন ডাক্তার বসতে শুরু করেছে। বরিশাল মেডিকেল থেকে পাশ করা। আমারচে এক বছরের জুনিয়র। তেলিগাতি, ফুলবাড়ি গেটের পাশেই বাড়ি। ওকে চেম্বারে ডেকে পাঠালাম। বললাম,

– দেখো, আমার ইরান যাবার একটা সুযোগ এসেছে। যেতে পারলে বিআইটির চাকরীটা আমি তোমাকে দিয়ে যাবো। তবে একটা উপকার করতে হবে।

তেলিগাতির ছেলে, বাড়ির খেয়ে বিআইটিতে ডাক্তারি করবে, এরচে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে? খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। বলে,

– এ তো খুব সুখবর বস। খালি কন, কী কত্তি হবে? বিআইটির চাকরিটা পালি আমার আর কোনো চিন্তা থাকপি না।

ওকে বুঝিয়ে বললাম। আমি ২৯ তারিখে ছাত্রদের চেকআপ করে নাইট কোচে ঢাকা যাবো। ও শুধু ৩০ তারিখটা সামলাবে। আমি পরীক্ষা দিয়ে সেই রাতেই ফিরে আসব। ৩১ তারিখ আবার আমি সামলাবো। যদিও খুব টাইট শিডিউল। তবে সামলে নিতে পারব। তাছাড়া উপায়ও তো নেই। চাকরীর প্রতি আমার দায়বদ্ধতাকে অস্বীকার করতে পারি না।

২৯ তারিখ সারাদিন মেডিকেল চেকআপ করলাম। ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হবে। হার্টের গতি, চোখের দৃষ্টি, অঙ্গহানি, ইত্যাদি পরীক্ষা করা ঠিক আছে। তাই বলে হার্নিয়া হাইড্রোসিল কেন পরীক্ষা করতে হবে, আজও আমার মাথায় আসে না। সারাদিন কাপড় খুলে ওই সব ঘাটাঘাটি করলে কার মেজাজ ঠিক থাকে? বিকেল গড়িয়ে যায়। বাসায় ব্যাগ গোছানোই ছিল। কোনো কথা না বলে এক কাপ চা খেয়ে ছুটি চেম্বারে। হয়ত কেউ বসে আছে। সুন্দরী বউয়ের মুখটাও দেখা হয়না ভালো করে।

রাত আটটায় ফুলবাড়ি গেট থেকেই নাইট কোচে উঠি। রাতের খাওয়াটা পথেই সেরে নেব। স্বাভাবিক নিয়মে ভোর চারটা পাঁচটার দিকে ঢাকা পৌছার কথা। একটু রেস্ট নিয়ে সকাল দশটায় পরীক্ষায় বসতে পারব। কিন্তু বিধির বাম এড়াবো কেমন করে?

তখন কামারখালীতে ফেরী ছিল। আষাঢ়ের ভরা বর্ষায় গড়াই নদীতে প্রচণ্ড স্রোত। তার উপর একটা ফেরী বিকল। কামারখালী পৌঁছে দেখি গাড়ির কয়েক মাইল লম্বা লাইন। সুপারভাইজারকে বললাম, ঢাকায় আমার সকালেই জরুরী কাজ। কটায় পৌঁছাবো ঢাকায়?

সুপারভাইজার কিছুক্ষণ পর খবর নিয়ে এলো, ভাগ্য ভালো হলে কাল দুপুর নাগাদ।

ছ্যাঁত করে ওঠে বুকের ভেতর। যেন আমার স্বপ্নের ওমে কেউ এক বালতি ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিল। হাল ছেড়ে না দেয়ার শিক্ষা দিয়েছিল আব্বা হাতে কলমে। তাই এত সহজে হাল ছড়বার পাত্র নই আমি। ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ি। মাইল খানেক হেঁটে যে গাড়িটি ফেরীতে ওঠার জন্য প্রস্তুত, তার সুপারভাইজারকে বললাম, আমাকে ঢাকা নিয়ে যাও। টাকা যত চাও দেবো।

সুপারভাইজারের নিরুত্তাপ জবাব, ছিট নাই।

আমি অনুনয় বিনয় করলাম। জরুরী কাজের দোহাই দিলাম। সীট লাগবে না। শুধু একটু দাঁড়াবার ঠাই দাও। মন গলল সুপারভাইজারর। মানবতা তখনও মরে যায়নি। বলল, ছিট কভারে বইয়া যদি যাইতে পারেন, তাইলে আহেন।

ডুবতে ডুবতে যেন একটা অবলম্বন খুঁজে পেলাম। বিধাতাকে ধন্যবাদ দিয়ে যেই সিট কাভারে বসেছি, অমনি ছ্যাঁত করে ওঠে পশ্চাতদেশ। বাবাগো মাগো বলে লাফিয়ে উঠি। গনগনে গরম হয়ে আছে ইঞ্জিন কভার। তখন এখনকার মত আধুনিক বাস ছিল না। পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসে ড্রাইভার। হেলপারকে ডেকে বলে, ওই ছ্যাড়া, একটা ছালাটালা বিছাইয়া দে। ব্যাডার পাছা পুইড়া কাবাব হইয়া যাইবো।

হেলপার একটা তেল কুটকুটে কাঁথার মতো কিছু বিছিয়ে দিল। আমি সেখানেই বসলাম। গাড়ি শেষ পর্যন্ত ফেরীতে উঠল। সামনে আরও দুটো ফেরি। গোয়ালন্দ আর দৌলতদিয়া। সেখানকার অবস্থা এত খারাপ না হলেও কম নয়। বার বার ঘড়ি দেখি। গড়ির কাঁটায় যেন পাঙ্খা গজিয়েছে। উড়ে উড়ে ঘুরছে। দুশ্চিন্তায় ঘুম তো দূরের কথা, ঝিমুনিও আসছে না। পদ্মা পার হতে হতে সকাল হয়ে যায়। আরিচা থেকে গাবতলি দুই ঘণ্টার পথ। আর কোনো অঘটন না ঘটলে ন’টা নাগাদ গাবতলি পৌছাবো। দশটায় পরীক্ষা। খোদা জানে, শেষ রক্ষা হবে কিনা। আমি নিয়তির হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে বসে থাকি।

আর কোনো অঘটন ছাড়াই ন’টায় গাবতলি পৌছাই। এখান থেকেই সোজা পরীক্ষার হলে যেতে হবে। নাস্তা তো দূরের কথা, একটু ফ্রেস হব, তারও সময় নাই। গাবতলি থেকে একটা স্কুটার নিয়ে সোজা শেরাটন। ভাগ্যিস, তখন এখনকার মতো ট্রাফিক জ্যাম ছিল না। পৌনে দশটায় শেরাটনে পৌঁছে যাই। সারারাত ঘুমাইনি, উসকোখুসকো চুল, শুকনো মুখ, কাঁধে ব্যাগ, ফাইভ স্টার হোটেলের দারোয়ান তো আমাকে ঢুকতেই দেবে না। শেষে এডমিট কার্ড দেখিয়ে রক্ষা। আমি ঢুকে দেখি, ততক্ষণে নাম ডেকে ডেকে লোক পরীক্ষার হলে ঢোকানো শুরু হয়ে গেছে। একজন পরেই আমার নাম ডাকল। মনে মনে খোদাকে শুকরিয়া জানিয়ে ব্যাগটাকে গেট ম্যানের হাওলায় রেখে হলে ঢুকে পড়লাম।

গত দুই বছর মেডিকেলের কোনো বইয়ের সাথে প্রেমালাপ না হলেও পুরনো প্রেমের স্মৃতিটুকু তখনও বেঁচে ছিল। পরীক্ষা বেশ ভালো হয়। নিশ্চিত সিলেক্ট হয়ে যাবো। এতক্ষণে পেটের ভেতর আষাঢ়ের মেঘের গুরুগুরু ডাক শুনতে পাই, সাথে নিম্নচাপের দশ নম্বর মহা বিপদ সংকেত। ফাইভ স্টার হোটেলে না খেতে পারি, ফেরিঘাটের ডিম পরোটা আর পদ্মার পানি যা কিছু ছিল, নিশ্চিন্তে দান করে দেই দুধ সাদা পাঁচ তারকা শৌচাগারে। হালকা হয়ে ফুরফুরে মেজাজে হোটেল শেরাটন থেকে বের হই। যেন তারকা খচিত স্বর্গ হতে ধূলির ধরায় নেমে এলাম। বাইরের আকাশেও আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ, তবে বৃষ্টি নেই। গতরাতে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, নাইট কোচে যাবার রিস্ক নেয়া ঠিক হবে না। রাতে শুধু দুটো পরোটা আর ডিম খেয়েছি। সেই থেকে পেটে দানাপানি কিছু পড়েনি। খালি জায়গা পেয়ে পেটের গড়ের মাঠে ছুঁচোগুলো দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে। ভাবলাম, গাবতলি যেয়ে যে বাস পাব, আগে তাতেই উঠে বসব। তার পর পেট পূজো। বুঝিনি, ভোগান্তির তখনও অনেক বাকি।

দুটোয় গাবতলি পৌঁছে তো মাথায় হাত। খাজুরার ব্রিজ ভেঙ্গে গেছে। দক্ষিণ বঙ্গের সব বাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। মুহূর্তে আমার সব খিধে উবে গেল। খুলনা কীভাবে যাব? বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখার শিক্ষা দিয়ে গেছেন আব্বা। ভাগ্যিস পকেট ভরে টাকা এনেছিলাম। বিকেল পাঁচটায় বিমানের একটা ফ্লাইট আছে যশোরের। সেখান থেকে দুঘণ্টায় খুলনা।
ছুটলাম মতিঝিল বিমান অফিসে। তিনটেয় পৌঁছাই সেখানে। সেখানেও বিধি বাম। কোনো টিকেট নেই। থাকার কথাও নয়। বাস যে বন্ধ! খুলনায় যাবার আর কোনো উপায় রইল না। পিতৃসম প্রিন্সিপ্যাল স্যারের ভরসা উঠে যাবে আমার উপর থেকে। অনেকগুলো ভর্তিচ্ছু ছেলেমেয়ে, সাথে অনেকের বাবা মা ও আছেন। আমার জন্য অপেক্ষা করবে। নতুন সে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করারও কোনো উপায় নেই, যে তাকে আর একদিন সামলাতে বলব। কেলেঙ্কারির এক শেষ হয়ে যাবে। দুশ্চিন্তায় আমার সব চুল যখন ছিঁড়ে ফেলার উপক্রম, তখনই হঠাৎ মনে পড়ে, বন্ধু সাঈদের সাথে একবার লঞ্চে করে হুলারহাট গিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় ঢাকা সদর ঘাট থেকে ছাড়ে। নদীতে তো আর ট্রাফিক জ্যাম নেই! অনায়াসে খুব ভোরে হুলারহাট পৌঁছায়। ওখান থেকে তিন সাড়ে তিন ঘণ্টায় খুলনা যাওয়া যায়।

যেই ভাবা, সেই কাজ। ব্যাগ নিয়ে ছুটলাম সদরঘাট। তখন একটা মাত্র লঞ্চ যায় হুলারহাট। ততক্ষণে বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। লঞ্চ ছাড়ি ছাড়ি করছে। লাফ দিয়ে উঠে পড়ি। উঠে তো পড়লাম। কিন্তু মুশকিল বাঁধল অন্য খানে। লঞ্চের ডেকে ট্রাভেল করতে হলে চাদর, বালিশ, কাঁথা এইসব লাগে। ওসব কিছুই নেই আমার সাথে। ততক্ষণে লঞ্চ মাঝ নদীতে। সদরঘাট থেকে কিনে নেব, তারও উপয় নেই। তার উপর অনিদ্রায় অনাহারে আমার শরীরের যা অবস্থা, চাদর বালিশ ছাড়াই যে কোনো জায়গায় শুয়ে পড়লে সোজা লাশ হয়ে যাব, তখন টাকা তো বটেই, কাপড় খুলে নিয়ে গেলেও টের পাব না। বয়াতী বংশের পোলার ইজ্জতের ই ও থাকবে না। একমাত্র উপায় ফার্স্ট ক্লাস কেবিনে যাওয়া। যেখানে নিশ্চিন্তে ঘুমোবার সব বন্দবস্ত আছে।

খুঁজে পেতে টিকেট মাষ্টারকে বের করি। জিজ্ঞেস করি, কোনো কেবিন খালি আছে কিনা। সাফ জবাব, খালি নাই। ডাক্তার হবার একটা সুবিধা আছে। সব দেশেই পরিচয় দিলে একটু বাড়তি সুবিধা মেলে। যেন ভবিষ্যতে আমি তার ফ্রি চিকিৎসা করে দেবো। অনেকে তো সুযোগ বুঝে তখনই কিছু পরামর্শ নিয়ে নেয়। আমি ডাক্তার বলেই হোক, কিংবা আমার ক্যাবলা-কান্ত মার্কা চেহারার জন্যই হোক, লোকটার মায়া হয়। বলে, “ছার, কেবিন তো খালি নাই। তয় একজোন বরো সাইবে ডবল কেবিনে এলহা যায়। আমহে হ্যারে কইয়া দ্যাকতে পারেন”।

দূর থেকে কেবিন দেখিয়ে দেয়। দেখি কেবিনের সামনেই ডেক চেয়ারে বসে আছেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। আমি কাছে যেয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে সব খুলে বলি। ভদ্রলোক আমাকে অবাক করে দিয়ে রাজি হয়ে যান। বলেন, ভালোই হল, একা একা বোরিং লাগছিল। তোমার সাথে গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে।

বেশ বড়সড় ভিআইপি কেবিন। দুপাশে দুটো বেড। বাসর রাতের বিছানা দেখেও বুঝি এত খুশি হইনি। যেন সম্রাট আকবরের জন্য মখমলে পালঙ্ক সাজিয়ে রেখেছে যোধাবাঈ। সেই সাথে একটু পরে রাজভোগও এলো। আলাপচারিতায় জানলাম, সরকারি বড় কর্মকর্তা। সেক্রেটারি লেভেলের। সে রাতে অনেক গল্প হল। আমার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনলেন আমার জীবন কাহিনী। আমি কেবিন ভাড়া ও খাবারের অর্ধেক দাম দিতে চাইলাম। হেসে বললেন, টাকা দিতে হবে না। তোমার কাছ থেকে হাল না ছাড়ার যে শিক্ষা আজ পেলাম, তা আমি বাকি জীবন মনে রাখব। আমি দোয়া করছি, তুমি দেখে নিও, একদিন অনেক বড় হবে তুমি। অনেক বড়।

কতটুকু বড় হতে পেরেছি, আমি জানিনা। তার নাম কিংবা চেহারা, কিছুই আজ আর মনে পড়ে না। তবে তার ভবিষ্যৎ বাণী আজও আমাকে সাহস দেয়, প্রেরণা যোগায়। এমনই করে জীবনে চলার পথে কত ভালো মানুষের দেখা পেয়েছি, পেয়েছি তাদের ভালোবাসা, পেয়েছি মানবতার শিক্ষা। এখনও শিখছি। এখনও যখন হতাশ হয়ে যাই, যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখনও মনে হয়, কোথাও কোনো একটা দরজা হয়ত এখনও খোলা আছে আমার জন্য। কেউ একজন হয়ত বাড়িয়ে আছে ভালোবাসার দুটি হাত।