অভিমতলীড

নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্তহীনতায় দিশেহারা করোনার ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধারা!

ডা. কামরুল হাসান :

করোনার বয়স প্রায় এক বছর হতে চলল কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের নীতি নির্ধারকরা নিজেদের গুছিয়ে উঠতে পারেননি।উনারা একবার বলে ডানে যাও, একবার বলে বামে যাও। তাদের অস্থিরতা, সিদ্ধান্তহীনতায় যারা ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা (ডাক্তার, এসএসএন, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী) তারা দিশেহারা।

তবে ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা কারা তা নিয়ে মতভেদ আছে, যারা মাঠ প্রশাসনে তদারকি করেন (ডিসি, ইউএনও, এসিল্যান্ড), পুলিশ প্রশাসন (এসপি, ওসি, কনস্টেবল)? না-কি, মিডিয়াকর্মী- যারা প্রতি মুহুর্তের খবর আমাদের মাঝে প্রচার করে তারা ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা!

আমাদের মন্ত্রী, সচিব অনেকেই তাদের কাউকে কাউকে ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করেছেন, সম্মানিতও করেছেন। তবে ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধা ঘোষণা না দিলেও সবার আগে দুই মাসের বেসিকের সমপরিমাণ প্রণোদনা পেয়েছেন সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই।

প্রণোদনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং বারবার তা পরিবর্তন করা হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেলায়। প্রথমে বলা হলো- সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ শয্যার আইসোলেশন ওয়্যার্ড খোলার জন্য। প্রায় সবাই সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৫ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করে। আইসোলেশন ওয়ার্ড এ যারা ডিউটি করবে তাদের ডিউটি রোস্টার নির্ধারণ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে/মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হলো। এপ্রিল, মে, জুন পরবর্তীতে তা চলমান ছিল, এখনো আছে।

অনেক দুর্গম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সদরের সাথে যাতায়ত ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সেই ৫ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়া হল এবং তাদের সুস্থ করে তোলা হলো। এক পর্যায়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ৫ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডকে ১০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডে পরিণত করা হলো। সেই ওয়ার্ডে ৯/১০ জন রোগী ভর্তি থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে।

অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝে ও করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা চালিয়ে গেছে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, যেখানে অক্সিজেন সিলিন্ডারেরই ব্যাপক সংকট, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই তো আকাশ কুসুম ব্যাপার। করোনা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে অনেক ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।

এখন প্রণোদনা দেয়ার সময় নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে (মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল) যারা করোনা রোগীদের সরাসরি সেবা দিয়েছে তাদের এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ টাকা প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হবে!

প্রথমে বলা হয়েছিল করোনা রোগীদের সেবার সরাসরি নিয়োজিত সবাইকে দুই মাসের বেসিকের সমপরিমাণ প্রণোদনা দেয়া হবে!

যেসব উপজেলায় করোনা রোগীদের সেবা দেয়া হল, সেবা দেয়ার পরও কেন সেইসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে গণ্য করা হবেনা। যারা দিন রাত এক করে করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে গেল তারা কেন প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হবে? যদি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে গণ্য না-ই করা হবে, তবে কেন ৫ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলার আদেশ দেয়া হলো? সেই ওয়ার্ডে সেবা দেয়ার জন্য আলাদা মেডিকেল টিম নিয়োজিত করা হলো? তাদের এই শ্রমকে কেন মূল্যায়ন করা হবেনা? নার্সিং অধিদপ্তর তো ঠিকই নার্সদের সবাই যেন প্রণোদনা পায় তা নিশ্চিত করছে তাহলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর/মন্ত্রণালয় কেন ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ডেডিকেশনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছেনা?

প্রণোদনা দেন বা না দেন, নিত্যনতুন সিদ্ধান্ত নেয়া এবং বারবার তা পরিবর্তন করে বিষয়টাকে গুরুত্বহীন করে ফেলছেন এবং ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধাদের মনোবল ভেংগে দিচ্ছেন।