খবরজাতীয়লীড

হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের তাণ্ডব; সন্ত্রাসী হামলায় ৫ চিকিৎসক আহত

জামালপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ষাটোর্ধ বয়সের এক নারী রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জরুরি বিভাগে সন্ত্রাসী হামলা ও ভাংচুর করেছে রোগীর স্বজনরা। হামলায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকার ও চারজন ইন্টার্ন চিকিৎসক গুরুতর আহত হয়েছেন। ২৫ ডিসেম্বর দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর থেকে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২৫ ডিসেম্বর বেলা পৌনে একটার দিকে জামালপুর শহরের ইকবালপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ করিমনকে (৬৪) জামালপুর সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান রোগীর কয়েকজন স্বজন। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসা কর্মকর্তা চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ করে রোগী করিমনকে হাসপাতালের মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে বলেন। তাকে ওই ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় বেলা একটা ৮ মিনিটে।

ওয়ার্ডে কর্তব্যরত নার্স ও চারজন ইনটার্ন চিকিৎসক রোগীকে ভর্তি করিয়ে অক্সিজেন দেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে রোগী আরও শঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়লে রোগীর স্বজনরা বেশি মাত্রায় অক্সিজেন দিতে বলেন। কিন্তু দায়িত্বরত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বেশি মাত্রায় অক্সিজেন দিতে রাজি না হওয়ায় রোগীর স্বজনদের সাথে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের তর্কের একপর্যায়ে রোগীর স্বজনরা চারজন ইন্টার চিকিৎসককে মারধর করেন। এতে তারা গুরুতর আহত হন। তারা সবাই শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী।

পরে রোগীর স্বজনরা রোগীকে ওয়ার্ড থেকে তুলে নিয়ে পুনরায় জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসা কর্মকর্তা চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকার রোগীকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় রোগীর স্বজনরা অবহেলায় তাদের রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ তুলে জরুরি বিভাগে হট্টগোল বাজান। একপর্যায়ে রোগীর স্বজনরা জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকারের কক্ষে হামলা, তাকে বেধড়ক মারধর, জরুরি বিভাগের আরও দুটি কক্ষের আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ভাংচুর এবং ফাইল খাতাপত্র তছরুপ করেন।

রোগীর স্বজনদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জামালপুর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তার কক্ষ। ছবি : বাংলারচিঠিডটকম
এর কিছুক্ষণ পর রোগীর এলাকা ইকবালপুর থেকে আরও অর্ধশত লোকজন হাসপাতালে গিয়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করে। এ সময় শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের বিভিন্ন বর্ষের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সাথে রোগীর পক্ষের লোকজনদের দুই দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে জামালপুর সদর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ সেখান থেকে কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ অন্তত ১০ জনকে আটক থানায় নিয়ে যায়। পরে তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।

বহিরাগতদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকার, ইন্টার্ন চিকিৎসক রিয়াদ মাহমুদ, হাবিবুল্লাহ রহমান, রাকিবুল হাসান ও রিদম। তাদের মধ্যে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের আবাসিক হলে এবং চিকিৎসা কর্মকর্তা চিকিৎসক চিরঞ্জীব সরকার হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের রেস্টরুমে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অবস্থা খুবই সঙ্কটাপন্ন।

এদিকে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জরুরি বিভাগে হামলা, ভাংচুর এবং চিকিৎসকদের মারধর করে আহত করার ঘটনার পর থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ২৫ ডিসেম্বর বিকেল ৫টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগের আসবাবপত্র তছরুপ অবস্থায় পড়ে আছে। কোন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নেই। জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনরা ফেরত যাচ্ছেন।

জামালপুর সদর হাসপাতালের সহকারী পরিচালক চিকিৎসক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান এ ঘটনা প্রসঙ্গে এ প্রতিবেদককে বলেন, হাসপাতালের ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগে হামলা, ভাংচুর এবং চিকিৎসা কর্মকর্তা ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মারধর করে আহত করার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে জরুরি ভিত্তিতে এ ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জামালপুর সদর থানার ওসি মো. রেজাউল ইসলাম খান এ প্রতিবেদককে বলেন, সদর হাসপাতালে গন্ডগোলের ঘটনায় কোন পক্ষ থানায় অভিযোগ নিয়ে আসেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনকে আটক করে থানায় আনার পর তাদেরকে ছেড়ে দিয়েছি।