গুণীডাক্তার পরিচিতিলীড-7

কিংবদন্তি চিকিৎসক এম আর খান

নিরাময়২৪.কম ডেস্ক :: এ দেশের চিকিৎসা সেবায় একটি বিশিষ্ট নাম ডা. এম আর খান। তার পুরো নাম ডা. মোহাম্মদ রফি খান। আমাদের গর্ব যে তিনি জাতীয় অধ্যাপক এবং সমাজসেবায় একুশে পদকপ্রাপ্ত। একাধারে অনেক গুণে বিশেষায়িত তিনি। শিশুচিকিৎসক, সমাজ হিতৈষী, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসাক্ষেত্রে দক্ষ প্রশাসক, চিকিৎসা-শিল্প উদ্যোক্তা এর সবগুলো গুণেই ভূষিত করা হয় তাকে। আজ ১ আগস্ট তার ৮৮তম জন্মদিন। তাকে জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ডা. এম আর খানের চিকিৎসক জীবন বর্ণাঢ্য। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার কেন্ট হাসপাতালে সহকারী রেজিস্ট্রার ও এডিনবরা গ্রুপ হাসপাতালে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর দেশে ফিরে ১৯৬৩ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। দেশপ্রেমই অর্থের প্রাচুর্য ছেড়ে তাকে দেশে টেনে এনেছিল। শিশুচিকিৎসার ওপর বিদেশের বড় ডিগ্রি অর্জন, সেখানে উঁচু মাপের চাকরির সুযোগ ও সুবিধা পরিত্যাগ করে চলে এসেছেন নিজ দেশে। দেশে শিশুচিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় প্রতিষ্ঠায় অবতীর্ণ হয়েছেন পথিকৃতের ভূমিকায়।

১৯৬৪ সালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (শিশুস্বাস্থ্য) পদে যোগদান করেন। ১৯৬৯ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে তিনি ইনস্টিটিউট অব পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধ্যাপক ও ১৯৭৩ সালে এই ইনস্টিটিউটের যুগ্ম পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা শিশু হাসপাতালে অধ্যাপক ও পরিচালকের পদে যোগদান করেন। ওই বছরই আবার তিনি বিএসএমএমইউয়ের শিশু বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি সুদীর্ঘ চাকরিজীবন থেকে অবসর নেন।

বলা যায়, চিকিৎসাক্ষেত্রে ডা. এম আর খান একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। ১৯৭৮ সালে ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় তার ছিল অনন্য ভূমিকা। এ হাসপাতালে তিনি আউটডোর, প্যাথলজি, রেডিওলজি ডিপার্টমেন্ট, পেয়িং ইউনিট, ইউনেটোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইউনিট ইত্যাদি স্থাপনসহ বেডের সংখ্যা ১৫০ থেকে ২১৫-তে উন্নীত করেন। তিনি বিএসএমএমইউ-এ পেডিয়াট্রিক পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট কোর্স চালু করেন।

অন্যদিকে ১৯৮৬ থেকে এ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সের কাউন্সিলর, ১৯৮৮ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন বিভাগের `এমএসসি`, `এমফিল` ও পিএইচডি কোর্সের পরীক্ষক। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য এবং ১৯৯৩ সাল থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের কার্যবিধায়ক কাউন্সিলের সিনিয়র সদস্য অধ্যাপক এম আর খান আহছান উল্লা ক্যান্সার হাসপাতালের উপদেষ্টা সদস্য এবং বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও প্রবীণতম সদস্য। তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের নতুন পেডিয়াট্রিকস ইউনিট প্রতিষ্ঠা করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে উপযোগী এফসিপিসি, ডিসিএইচ ও এমসিপিএস নতুন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট কোর্স প্রবর্তন করেন। তা ছাড়া বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা, প্রশাসন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ডা. খানের অবদান অনস্বীকার্য।

অধ্যাপক এম আর খান একজন লেখক ও গবেষকও। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তার ৩৭টি গবেষণাধর্মী রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তা ছাড়া তিনি শিশুরোগ চিকিৎসা-সংক্রান্ত বই লিখেছেন সাতটি, যা দেশে ও বিদেশে বহুল প্রশংসিত। বইগুলো হচ্ছে: ‘Essence of Paediatrics’, ‘Pocket Pediatric Prescriber’, ‘Essence of Endocrinology’, `প্রাথমিক চিকিৎসা`, `মা ও শিশু`, `আপনার শিশুর জন্য জেনে নিন`, `শিশুকে সুস্থ রাখুন` এবং `ড্রাগ থেরাপি ইন চিলড্রেন। এ ছাড়াও একাধিক গ্রন্থের তিনি সহপ্রণেতা।

তার মহৎ অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৫ সালে সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক পদবিতে ভূষিত করেছে। তার কারণেই এই দেশে শিশু চিকিৎসাক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা সম্ভব হয়েছে।