গুণীফিচারলীড-10

সরকারী হাসপাতাল চালাতে বুকের পাটা লাগে!

আতাউর রহমান কাবুল :

গত মঙ্গলবারের ঘটনা। বেলা সাড়ে ১১ টা।

আমি তখন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক ও দেশের বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ স্যারের রুমে। বাইরে রোগীর বেশ ভিড়। রোগীরা ১০ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে অপেক্ষা করছে স্যারকে দেখাবেন বলে। স্যার একে একে রোগী দেখছেন। রুমে আরো কয়েকজন চিকিৎসক রোগীর কাগজপত্র দেখছেন, দীন মোহাম্মদ স্যারের নির্দেশনা শুনে শুনে প্রেসক্রিপশন লিখছেন।
এর মধ্যে একজন লোককে স্যারের সামনে হাজির করা হলো। না, তিনি কোন রোগী নন। তিনি এলাকার মাস্তান গোছের কেউ! তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের হোতা। অন্য কোন অ্যাম্বুলেন্সকে ওই হাসপাতালে ঢুকতে দেন না। কেউ ঢুকলে ড্রাইভারকে প্রচন্ড মারধর করে বের করে দেন।

দীন মোহাম্মদ স্যারের সামনে লোকটি অপরাধীর মতো দাড়িয়ে আছেন। স্যার একে একে বলে যাচ্ছেন, ‘শোন, তোমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। তোমার কারণে এই হাসপাতালে বাইরের কোন অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারে না। অথচ তোমাদের অ্যাম্বুলেন্সের রেট অনেক বেশি। কেন? রোগীরা তো এমনিতেই অসহায় হয়ে হাসপাতালে আসেন। কোন রোগীর লোক যদি কিছু কম টাকায় অ্যাম্বুলেন্স পায়, তাতে তোমাদের সমস্যাটা কি?’

মাস্তান টাইপের লোকটি অনেকটা নিরুত্তর। সে তার মতো করে কি কি যেন বলে যাচ্ছেন। দীন মোহাম্মদ স্যার ক্ষেপে গিয়ে বলে চলছেন, ‘ওই দিন যদি তোমাকে পেতাম তাহলে তোমার পা ওপর দিকে তুলে পিটাতাম….। শোন, তোমাকে শেষ বারের মতো সাবধান করে দিচ্ছি। এরপর যদি এমন অভিযোগ পাই, তাহলে কিন্তু পুলিশে দেবো। আজ সকালে ওসি সাহেবকে ডেকেছিলাম। আমি সব বলে রেখেছি। আর মনে রেখ, তুমি যত বড়ই মাস্তান হও না কেন, যত ক্ষমতাশালীই হও না কেন-আমি পুলিশে দিলে তুমি কিন্তু সহসাই জামিন পাবে না।’

ঘর ভর্তি লোক অথচ পিন পতন নিস্তব্ধতা। আমি স্যারের কথার মাঝে প্রশ্ন করলাম, এরা কি সিন্ডিকেট করে ফেলেছে নাকি? স্যারসহ সবাই আমার দিকে তাকাতে থাকলো। নেতা ও মাস্তান টাইপের লোকটিও আড়চোখে আমার দিকে তাকালো। আবার কি যেন কাচু মাচু করে বলতে চাইলো।

দ্বীন মোহাম্মদ স্যার ধমক দিয়ে বললেন, ‘এখন থেকে এই এরিয়ায় কোন অ্যাম্বুলেন্স-ই যেন আমার নজরে না পরে। সব অ্যাম্বুলেন্স থাকবে গেটের বাইরে। যাও।’
লোকটি চলে গেলো।

২.
ঢাকার বিভিন্ন সরকারী হাসপাতালগুলো সিন্ডিকেটের দখলে। এসব সিন্ডিকেট এতোটাই শক্তিশালী যে, পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াও তাদের নিয়ন্ত্রণে। কোটি কোটি টাকার মেশিনপত্র কেনাকাটার অনিয়ম নিয়ে পত্র পত্রিকায় আমরা দুই একটি সংবাদ প্রকাশ করলেও তা যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। সিন্ডিকেট সিন্ডিকেটের মতোই চলছে। বড়ো বড়ো সরকারী হাসপাতালগুলোর পরিচালকগণও অসহায় এসব সিন্ডিকেটের কাছে। এমন অসহায়ত্বের কথা আমাকেও প্রায়ই বলেন কয়েকটি হাসপাতালের পরিচালকগণ। তাদের নাকি কিছুই করার নেই। সিন্ডিকেটের বাইরে গেলে তারা নাকি চেয়ার ধরে রাখতে পারবেন না…!

৩.
আগারগায়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের (http://www.nins.com.bd) একটা আলাদা সুনাম রয়েছে। ৩০০ বেডের এই হাসপাতালে স্নায়ুতন্ত্রের সব ধরনের রোগের চিকিৎসা হয়, বেশিরভাগই বিনামূল্যে। পরিচ্ছন্নতায় সরকারি হাসপাতালের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে এটি। লোকবল সংকট সত্বেও ঝকঝকে চকচকে হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে কারো কোন অভিযোগ নেই। সারাদেশ থেকে রোগী আসে এখানে। রোগী ধরতে কোন দালালের উৎপাত নেই। প্রতিটি তলার প্রতিটি ওয়ার্ড, করিডর, বারান্দা, বাথরুম বেশ পরিষ্কার। দুর্গন্ধ এড়াতে নাকে রুমাল চাপতে হয় না। বহির্বিভাগে জ্যেষ্ঠ চিকিত্সকদের রোগী দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। টিকিট কাটা, টাকা জমা দেওয়া, জরুরি বিভাগ বা বহির্বিভাগে রোগী দেখানো সব জায়গাতেই শৃঙ্খলা চোখে পরার মতো। প্রতিটি তলায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত আছেন চিকিৎসক, নার্স, আয়া ও ওয়ার্ডবয়।

বলছিলাম কি, সরকারী হাসপাতাল চালাতে বুকের পাটা লাগে। যে বুকের পাটা আছে একজন দীন মোহাম্মদ স্যারের। তাইতো তিনি এবং তার হাসপাতাল আজ অনন্য উচ্চতায়।

স্যালুট টু ইউ স্যার! বেস্ট উইসেস।

লেখক : কা‌লের কন্ঠর স্বাস্থ্য‌বিষয়ক সাংবা‌দিক।