লীড-6শিক্ষা কথা

রেসিডেন্সি ভর্তি পরীক্ষার অভিজ্ঞতা

তুহিন বড়ুয়া তমাল

নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করছি। কাজে লাগতে পারে আপনাদের –
রেসিডেন্সি পরীক্ষায় যে বিষয় গুলা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো –
১) ফিজিওলজি
২) মাইক্রোবায়োলজি
৩) প্যাথলজি
৪) ফার্মাকোলজি
৫) এনাটমি + অন্যান্য।
আমি সিলেটে কোচিং করেছিলাম ইন্টার্ণির পর। অনেকেই কোচিং টোচিং শুনলে নাক সিটকায়। কিন্তু আমার নিজের মনে হয়েছে কেউ যদি সময় বাঁচাতে চায়, গোছানো একটা সিলেবাস পেতে চায় তার কোচিং করা উচিৎ। এছাড়া এমন কিছু টিপস পাওয়া যায় কোচিং এ যা নিজে নিজে পড়লে মিস হতে পারে।
দিলীপ স্যারের নোট সংগ্রহে আসলে সেইগুলা ভীষণ কাজে আসে। দিলীপ স্যারের নোট গুলা প্রথমে এনাটমি, তারপরে ফিজিওলজি, ডেভিডসন এইভাবে সাজানো। এবং যে টপিক গুলা বেশি জরুরি শুধু ঐগুলাই সন্নিবেশিত। টপিক গুলা রেফারেন্স বই থেকে সাজানো বলে এক্সট্রা করে গাইটন, গ্যানং পড়ার প্রয়োজন / ইচ্ছাশক্তি পাইনাই।
প্রথমে দিলীপ স্যারের নোট পড়েছি কোন একটা সিস্টেম পড়তে গিয়ে। এরপরে ঐ সিস্টেমের গাইডের হেল্পলিংক+MCQ সলভ করেছি।

গাইড কোনটা ভালো?
ইমপালস এ শুনেছি ভুলের পরিমান কম। কিন্তু প্রশ্ন সংখ্যা খুব একটা বেশি না। তাই নিতে গিয়েও নি নাই।
জহির নতুন বেরিয়েছে। তাই এটা কিনতে ইচ্ছে হয়নি। যদিও হেল্প লিংক গুলা ভালোই।
শেষ পর্যন্ত কিনলাম ম্যাট্রিক্স। ম্যাট্রিক্সের সুবিধা হচ্ছে একদম সেই ১৯৯৮ সালের এমডি পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যন্ত সংযুক্ত করা আছে। তবে এই বইতেও MCQ উত্তর গুলার মধ্যে ভুল আছে। কিছু হেল্প লিংকের রেফারেন্স দেয়া নাই। তাই দ্বিধান্বিত হবার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
এরপরে ম্যাট্রিক্সের যতগুলা MCQ এর উত্তর সম্ভব হয়েছে Verify করে পড়া শুরু করেছি। এই উত্তর যাচাই করে পড়তে গিয়েই আমার ২-২.৫ মাস শেষ! হাতে একদম সময় নাই। মাথা ঘুরা শুরু হয়ে গেছিলো। শেষ পর্যন্ত অনেক ঘাটতি রেখেই পরীক্ষায় বসতে হয়েছিলো আমার।
আমি মাইক্রোতে ১ বছর লেকচারার হিসেবে ছিলাম। তাই মাইক্রোবায়োলজি প্রিপারেশন নিতে মোটেও কষ্ট হয়নি।
প্যাথোলজি শুধু General অংশ থাকে বলে প্যাথোলজি পড়তেও সময় লাগেনি।
সমস্যা হয়ছিলো ফার্মা আর এনাটমি নিয়ে। এরমধ্যে ফার্মা শেষ সময়ে গুছিয়ে ফেলতে পেরেছি। কিন্তু এনাটমি আর সম্ভব হয়নি।

এখন বলি কি কি বইপত্র আমি সংগ্রহ করেছিলামঃ
১) দিলীপ স্যারের নোট (ভালো ছাত্ররা মেইন বই পড়ুন)
২) ম্যাট্রিক্স রেসিডেন্সি গাইড (ইমপালস, জহির এই দুইটাও অপশন হতে পারে)
৩) Vision ফিজিওলজি (কাজে লেগেছে, লাগবেই)
৪) Genesis এর ‘200 topic’ (এইটাও আমার কাজে লেগেছে মোটামুটি। বারবার আসা ২০০ টপিক নিয়ে সাজানো বইটা। নেয়া যেতে পারে। কাজে লাগবে)
৫) Genesis এর ‘Last hour’ (ভয়াবহ রকম বাজে বই। শেষ ৫ বছরের প্রশ্ন নিয়ে সাজানো। ভুল প্রচুর। আমার কুরিয়ার খরচ বাবদ ৬০০/- পুরাই গচ্চা। আশা করবো Genesis center বইটার ভুল ত্রুটি গুলা কাটিয়ে উঠবে)
৬) Concise এর ডাঃ মহিউদ্দিনের Basic science (খুব ভালো বই। কিন্তু পড়ার সময় পাইনি। আমার সাজেশন থাকবে এইটা কেনার। সবসময় কাজে লাগবে। FCPS, MD, MRCP ৩ টাতেই কাজে আসবে)
৭) Concise এর Previous question solve with explanation box. (এটাও অবশ্যই সংগ্রহ করার মতো। এই বইয়ের Strictly speaking, Golden rule এই টাইপের জিনিষ গুলা খুবি কাজে আসবে। ফার্মা এখান থেকে পড়লে খুব বেশি ভালো হবে আমার ধারনা)
৮) Roddie (কেউ আমারে মাইরালা, দুই তিন পাতা পইড়া বেহুঁশ হয়ে গেছিলাম। মাফ আর দোয়া চেয়ে টেবিলের এককোনে রেখে দিয়েছিলাম! ভালো ছাত্ররা পড়বেন। কাজে দিবে)
৯) Wikipedia, Google search (অসম্ভব কাজে এসেছিলো যখন MCQ এর উত্তর গুলা খুঁজতে গেছিলাম)
১০) তমাল স্যারের Lange থেকে সাজানো মাইক্রোবায়োলজি নোট (কাজে লাগবে কিন্তু!)

তাহলে এবার সাবজেক্ট গুলা দেখিঃ
*ফিজিওলজিঃ
অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। বেসিক টা যেভাবেই হোক স্বচ্ছ করার চেষ্টা করুন। তারপরে বারবার পড়তে থাকুন।
*মাইক্রোবায়োলজিঃ
অনেক প্রশ্ন থাকবে। বেশি বেশি পড়ুন। অনেক বেশি। Lange থেকে পড়ুন, দিলীপ স্যারের নোট থেকে পড়ুন। গাইডের MCQ পড়ুন।
* প্যাথলজিঃ
ম্যাট্রিক্সের প্যাথলজি অংশটাই আমার মনে হয় যথেষ্ট। রেফারেন্স বেশিরভাগই রবিন্স’র। এছাড়া Smiddy হতে শেষ অংশে গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষায় আসার মতো MCQ তুলে দেয়া আছে।
*ফার্মাকোলজিঃ
অনেক প্রশ্ন আসে। প্রশ্ন সমাধান করুন, Concise থেকে পড়ুন, Vision থেকে পড়ুন।
*এনাটমিঃ
নমঃ নমঃ।
আমি এনাটমিকে লাল সালাম দিয়ে প্রিপারেশন থেকে পত্রপাঠ বিদায় দিয়েছিলাম।
আমার মনে হয়েছে যতই পড়িনা কেন এনাটমি বাগে আনা খুবি কষ্ট হবে। মনে রাখবেন, এনাটমি যদি পড়তে পারেন আপনি অনেকের চেয়ে এগিয়ে গেলেন।
তবে হিস্টোলজি, এম্ব্রায়োলজি কোনক্রমেই বাদ দেয়া যাবেনা। MCQ সমাধান করুন। হেল্প লিংক গুলা পড়ুন গাইড থেকে। দিলীপ স্যারের নোট পড়ুন।
*হেমাটোলজিঃ
খুব গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাট্রিক্স + ছাত্রাবস্থায় পড়া শিট থেকে পড়েছি। আপনি আপনার মতো পড়ুন। ম্যাট্রিক্সের সমস্ত হেমাটোলজি MCQ সমাধান করুন।
*রিউমাটোলজিঃ
পার্ট১ এর পড়া কাজে লাগিয়েছিলাম। ডেভিডসন এর মার্কামারা কিছু চার্ট আছে। এগুলা পড়লেই অনেকটাই কাভার হয়ে যায়। ম্যাট্রিক্স থেকে প্রশ্ন সলভ করুন।
*বায়োকেমিস্ট্রিঃ
গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাট্রিক্স + Concise পড়ুন। পরীক্ষায় অনেক প্রশ্ন আসে। ভালো করে পড়তে পারিনাই বলে পরীক্ষায় প্রভাব পড়েছিলো।
*জেনেটিক্সঃ
মেন্ডেলিয়ান ডিসওর্ডার এর বৈশিষ্ট্য গুলা আর কোন গুলা অটোজমাল ডমিনেন্ট, কোনগুলা অটোজমাল রিসিসিভ, এক্স লিংকড রিসিসিভ ডিসিজ এইগুলা পড়লে ৮০% কাভার হয়ে গেছে ধরে নিতে পারেন।
* স্কিন, টক্সিকোলজি, সাইকিয়াট্রি ইত্যাদি থেকে ১-২ টা করে প্রশ্ন আসে। বাদ না দিলে উপকৃত হবেন। আমি পড়তে পারিনাই। তাই উপকৃত হতে পারিনাই।
* ডেভিডসন আলাদা করে পড়ার দরকার নেই বলেই মনে হয়েছে। ম্যাট্রিক্সের প্রত্যেক সিস্টেমের পরে Previous year Clinical question অংশে যেটুকু আছে তাই যথেষ্ট।
এবার অন্য কথাঃ

১) পড়তে ইচ্ছে করবেনা। আপনি একটা সার্কেল করুন। যাদেরকে পড়ার জন্যে আপনিই বারবার উদ্বুদ্ধ করবেন – উদ্দ্যেশ্য নিজেকে তাজা রাখা। আমি কয়েকজন প্রিয় বড়ভাই, বন্ধুকে প্রায়ই ফোন দিতাম। কথা বলে আত্মবিশ্বাস বাড়াতাম।

২) Pomodoro টেকনিক প্রয়োগ করুন। ২৫ মিনিট পড়া এরপরে ৫ মিনিট বিশ্রাম। খুবি কাজে দিবে। আমি এইটা করে উপকৃত হয়েছি।
এন্ড্রয়েড সেট থাকলে Pomodoro লিখে এপ্লিকেশন নামান।

৩) বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে বিভিন্ন লেখকের উৎসাহমূলক লিখা পড়ুন। খুব বেশি কাজে দিবে। আমি উপকার পেয়েছি।

৪) ভালো ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল কিনুন। আলাদা ফোল্ডার বানান। নাম দিন ‘পড়া’। যে টপিক গুলা মনে থাকেনা ছবি তুলে রেখে দিন। অবসর পেলেই ফোল্ডারে চোখ বুলান। খুব বেশি উপকার পেয়েছি।

৫) আল্লাহ্‌ / সৃষ্টিকর্তার নাম জপেন। এইটা মেডিটেশন হিসেবে কাজ দিবে। মনঃসংযোগ বাড়াবে (আমার কাজে এসেছে)

পরীক্ষা সংক্রান্ত কিছু তথ্যঃ
পরীক্ষায় ২০০ টা MCQ থাকে। মোট ১০০০ গোল্লা ভরাট করতে হয়। সময় ১৮০ মিনিট।
আমি মডেল টেস্ট দিতে পারি নাই। হিসেব কষে রেখেছিলাম-

প্রতি আধাঘন্টায় ৩৪ টা এবং প্রতি দেড় ঘন্টায় ১০০ টা MCQ দাগানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এবং খুব কাজে এসেছিলো এইটা। শেষে ৩ মিনিট এক্সট্রা সময় ছিলো হাতে!

টাইমিং হবে তাহলে→( পরীক্ষা ৯-১২ টা)
৯ থেকে ৯:৩০ মিনিটঃ ৩৪ নাম্বার MCQ তে আপনি
৯:৩০ থেকে ১০ টাঃ ৬৮ নাম্বারে
১০টা থেকে ১০:৩০ টাঃ ১০০ নাম্বারে
.
.
.
.
১১:৩০ থেকে ১২ টাঃ ২০০ নাম্বার MCQ দাগানো শেষ।
সাবজেক্ট ও ইন্সটিটিউট চয়েজঃ
আমার প্রথমে ইচ্ছা ছিলো এন্ডোক্রাইন। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। এখানে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতা। তাই বাদ। এরপরে চিন্তা করলাম ইন্টারনাল মেডিসিন। কিন্তু সিনিওর রা বললেন এমডি ব্রাঞ্চে করাই ভালো। ওদিকে ব্রাঞ্চের জন্যে বাঘা বাঘা প্রতিযোগী বসে আছে। তাই এই দুইটা বাদ দিয়ে পেডিয়েট্রিকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
সাবজেক্ট চয়েজ দেবার আগে ১০০ বার ভাবুন। হতাশ হোন। বিষণ্ণ হোন। ১০ জনকে নক করুন। বাস্তবতা বিবেচনা করুন। তারপরে সিদ্ধান্ত নিন।
ইন্সটিটিউট এর ক্ষেত্রেও একি কথা। ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। প্রতিযোগীর সংখ্যা কেমন আর ৫ বছর খেয়েপরে বাঁচতে পারবেন কিনা সেটা ভাবুন। কোন সন্দেহ নেই BSMMU আর DMC সেরা। এখানে কোর্স করতে পারলে সেরাটাই অর্জিত হবে।
————-*
আমার প্রিপারেশনে ঘাটতি ছিলো। আমার যায়গায় অন্য কেউ হলে আরো অনেক ভালো প্রিপারেশন নিতে পারতো। দেশের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান BSMMU তে চান্স হয়ে যেতো। তাও এই জং ধরা ভোঁতা মাথা ওয়ালা আমি SOMC তে সুযোগ পেয়েই মহা খুশি।
আমার ধৃষ্টতার জন্যে ক্ষমাপ্রার্থী।

ক্রেডিট:তুহিন বড়ুয়া তমাল
জালালাবাদ রাগেব রাবিয়া মেডিকেল কলেজ