লীড-8শিক্ষা কথা

এফসিপিএস ও এমএস/এমডিঃ একটি তুলনামূলক আলোচনা

ডা. হৃদয় রঞ্জন রায় :

ইদানিং জনমনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে এফসিপিএস ও এমএস/এমডি ডিগ্রী নিয়ে। বাংলাদেশে এ দুটি ডিগ্রী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাপকাঠি। কোন ডিগ্রী বড়? তাই এটি পরিস্কার করা প্রয়োজন।

১। বিসিপিএস কর্তৃক প্রদেয় ডিগ্রীই হল এফসিপিএস। এই বিসিপিএস বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রেসিডেন্টের (বঙ্গবন্ধু) অধ্যাদেশবলে এবং সংসদে প্রনীত আইনবলে পরিচালিত। আগেকার বেশিরভাগ এমএস/এমডি ডিগ্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়/ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়/ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদেয়। তবে সেসব বিশ্ববিদ্যালয় মার্কশিট ও সার্টিফিকেট টাইপ করা ছাড়া অন্য কোন ভূমিকাই রাখে না। তবে বর্তমানে এসব ডিগ্রী রেসিডেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় বিএসএমএমইউ কর্তৃক চলমান আছে। কিন্তু বিসিপিএস পরিচালিত হয় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার/ প্রফেসর কাউন্সিলর দিয়ে।

২। এমবিবিএস পাশ করার দেড় বছর পর এফসিপিএস ১ম পত্র পরীক্ষা দেবার যোগ্যতা অর্জিত হয়। পরীক্ষা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতিতে হয়। একই নিয়মে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমএস/এমডি ১ম পত্রে ভর্তি পরীক্ষা হয়। তবে এই ভর্তি পরীক্ষা সংশ্লিষ্ঠ প্রতীষ্ঠান নিজেই পরিচালনা করে। ফলে অনেক অনিয়মের খবর পাওয়া যায়। ইদানিং অবশ্য বিএসএমএমইউ কেন্দ্রীয়ভাবে ভর্তি পরীক্ষার সিস্টেম চালু করেছে। সেই পরীক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে অনেক গন্ডোগোলের খবর পত্রিকায় আসে।

৩। এফিসিপিএস ১ম পত্র পাশ করার পর সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে বিসিপিএস গাইডলাইন অনুযায়ী লগ বুক, ট্রেনিং, কাজের পারফরমেন্স, ডিজার্টেশন (রিসার্চ) ইত্যাদি করে ২য় পত্রের পরীক্ষার জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। এমএস/এমডি তে কিছু ক্লাস করে ১ম পত্র পরীক্ষা দিতে হয়। পাশ করলে ট্রেনিং কমপ্লিট করে ২য় পত্র পরীক্ষা দিতে হয়। ২য় পত্র পাশ করলে থিসিস পর্বে যেতে হয়। থিসিস সহ ৩য় পত্র পরীক্ষা দিতে হয়।

৪। এফসিপিএস পরীক্ষার স্থান, পরীক্ষক ইত্যাদি প্রার্থীরা জানতে পারে না। এমএস/এমডি পরীক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই হয় এবং সকল পরীক্ষক প্রার্থীদের পরিচিত।

৫। এফসিপিএস এ বিদেশী এক্সামিনার (ইন্ডিয়া, ব্রিটিশ, পাকিস্থান, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি) থেকে আসে। এমএস/এমডি পরীক্ষায় তেমন সিস্টেম নেই।

৬। ভাইভা/ প্রাকটিক্যাল/ ব্যবহারিক মিলে মোট ৮ জন এক্সামিনার এফিসিপিএস পরীক্ষা নেন। এছাড়াও ওসপি কেন্দ্রে আরও ৬/৭ জন এক্সামিনার থাকেন। এরমধ্যে যদি কোন পরীক্ষক সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর সরাসরি ট্রেইনার হন তবে তিনি থাকেন না। এমএস/এমডি তে মোট ৪ জন এক্সামিনার পরীক্ষা নেন। তারমধ্যে একজন সরাসরি তার ট্রেইনার ও গাইড। অন্যরাও পরিচিত। বিদেশী কোন এক্সামিনার কখনই আসেন না। উপরন্ত এফসিপিএস পাশ করতে না পেরে এমএস/এমডি কোর্সে ভর্তি হয়েছে এমন অনেক নজীর আছে। প্রভাব খাটানোর বিষয়ও আছে। কিন্তু এফসিপিএস এ এমন কোন নজীর নেই। মিথ্যা কিছু অভিযোগ অনেকে করে। কিন্তু তা একেবারেই মিথ্যা।

৭। এফসিপিএস (Fellow of College of Physicians and Surgeons) মানে কখনও কখনও হিপোক্রেসি করে বলা হয়ঃ Fail Confirm Pass Seldom. অর্থাৎ পাশ খুবই কঠিন বস্তু। কতজন যে ঝড়ে পরে যায় তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু এমএস/এমডি তে একবার ভর্তি পরীক্ষায় ঢুকে পড়তে পারলেই পাশ মোটামোটি কনফার্ম। ঝড়ে পরার রেকর্ড তেমন নেই বললেই চলে।

এসব বিবেচনা করে কি মন্তব্য করা যায়? এমএস/এমডি একাডেমিক ডিগ্রী? তারা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক (এসিস্টেন্ট প্রফেসর, এসোসিয়েট প্রফেসর, প্রফেসর) হবে? আর এফিসিপিএস ক্লিনিক্যাল ডিগ্রী? তারা কনসালটেন্ট (জুনিয়র ও সিনিয়র) হবে? এ প্রসঙ্গে আর একটি কথা না বললেই নয়। তাহল এখন পর্যন্ত এমডি/এমএস ছাত্র/ছাত্রীদের ক্লাস নেয়া, গাইড হওয়া, ট্রেনিং দেওয়া – ইত্যাদি কাজগুলো এফসিপিএস শিক্ষকরাই করছে। অথচ পাশ করতে না করতেই তারা তাদের শিক্ষদের চেয়ে নিজেদের বড় ভাবার প্রায়াস পাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রেই।

বিঃদ্রঃ কিছু কিছু সাবজেক্টে (যেমন অর্থো, কার্ডিয়াক সার্জারী, গাস্ট্রো এন্টারোলজি, কার্ডিওলজি ইত্যাদি) এফিসিপিএস ডেভেলপ করেনি। এই আলোচনায় সেসব সাবজেক্ট আসবে না।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সার্জারি বিভাগ, রংপুর মেডিকেল কলেজ।